ডেভিড ও গোলিয়াথের কাহিনী

লেখার নাম দেখে অনেকেই ভাবছেন আরে এতো আমাদের দুটো চেনা চরিত্র, এদের গল্প কে না জানে!! কিন্তু এই ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্প একদমই আলাদা। যদিও এই গল্পেও জয় ডেভিডেরই হয়েছে, তবে গোলিয়াথের মনে হারের দুঃখ একদমই নেই উল্টে গোলিয়াথের বেশ ভালোই লাভ হলো।

আমি যেমন অনেক কিছুই জানি না, বলা ভালো কোনো ব্যাপারেই আমার বিশেষ জ্ঞান নেই। তাও কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পাই মোটামুটি শেয়ার করেনি। ১০০ জনের মধ্যে ৯৮জন ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্প জানে, যে দুজন জানে না তাদের জন্য ছোট্ট করে বলে ফেলি। আমি স্কুলে পড়াকালীন বাইবেলে এই গল্পটা প্রথম পড়েছিলাম। অনেক যুগ আগের কথা তখনো যীশুখ্রীস্ট জন্মগ্রহণ করেননি, মেসোপটেমিয়ার রাজা দ্বিতীয় নেবুকাডনেজারের সাথে বিভিন্ন কারণ নিয়ে প্যালেস্টাইনের দক্ষিণ উপকূলে থাকা ফিলিস্টাইনদের ঝামেলা ছিল আর রাজার মর্জিমাফিক না চললে ঝামেলা যে লেগেই থাকে সেটা আমরা ২০১৯ বা ২০২০ তেও দেখতে পাচ্ছি । এরপর মেসোপটেমিয়া দিয়ে অনেক জল বয়ে যায়, ফিলিস্টাইনদের মাঝে উঠে আসে এক নতুন নেতা গোলিয়াথ, হিব্রু বাইবেল যাকে দৈত্য বলে আখ্যা দিয়েছে। আসলে সমাজের জড়ভরত সিস্টেমের বিরুদ্ধে কেউ রুখে দাঁড়ালেই সে এই ধরনের আখ্যা পেয়ে থাকে, কিন্তু গোলিয়াথকে পেয়ে ফিলিস্টাইনরা খুব খুশী, এবার রাজার চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে। বেশকিছু যুদ্ধে ইজরায়েলীয়দের গোলিয়াথ হারিয়েও দ্যায়, ভয়ে ইজরায়েলীয়রা ফিলিস্টাইনদের ধারেকাছে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ডেভিডের দাদা জেসি ছিল ইজরায়েলীয় সৈনিক, এইরকমই এক যুদ্ধের সময়, ডেভিড উপস্থিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে দাদার জন্য জল আর খাবার নিয়ে। সেই প্রথম ডেভিড গোলিয়াথকে চাক্ষুষ করে, গোলিয়াথের রণহুঙ্কার শুনে দাদাকে ডেভিড বলে, ” আপুন ইসকা ব্যান্ড বাজায়েগা”। দাদা তো রেগে আগুন, বলে কি পুঁচকে ছেলেটা, ভেড়া চরানো যার কাজ, সেকিনা গোলিয়াথকে মারবে!! কিন্তু ডেভিডও প্রতিজ্ঞায় স্থির, দাদাকে দিলো সেই আদি অকৃত্রিম ডায়লগ, যার কেউ নেই তাঁর সাথে ভগবান আছে। এই বলে পাঁচটা পাথর আর গুলতি নিয়ে গোলিয়াথের মুখোমুখি হলো। ডেভিডকে দেখে গোলিয়াথের প্রচুর হাসি পেলো আর খিল্লিও করলো। কিন্তু কথায় আছে স্যাকরার ঠুকঠাক আর কামারের এক ঘা, গুলতিতে পাথর লাগিয়ে ডেভিড দিল এক টান আর পাথর সোজা গিয়ে লাগলো গোলিয়াথের কপালের মাঝে। ঘটনার আকস্মিকতায় আর পাথরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল গোলিয়াথ আর সেই সুযোগে তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ করল ডেভিড।

এই ছিলো মোদ্দা গল্প, এবার ফিরে আসি আজকের ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্পে। কলকাতার শীত এবার শুরু থেকেই চালিয়ে খেলছে, কলকাতাবাসীর অভিযোগ করার কোনো সুযোগ দিতে সে রাজি নয়। অফিস থেকে বেরোতেই সে বুঝিয়ে দিলো আজ ফুল ফর্মে আছে। ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে চলেছি নাগেরবাজারের দিকে, এদিকে খিদেও পাচ্ছে। যত হাঁটছি খিদেটাও আস্তে আস্তে গোলিয়াথের মতো দৈত্যাকৃতি রূপ নিতে থাকল। নাগেরবাজার মোড়ের থেকে বাঁদিকে ঘুরতেই পেট আর খিদে দুজনেই গোলিয়াথের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল। তখনই আমি দেখা পেলাম ডেভিডের, মানে ‘ডেভিড ফাস্টফুড শপ’। এই ডেভিড অবশ্য পাথর আর গুলতি নিয়ে আমায় ওয়েলকাম করেনি, বরং একরাশ লোভনীয় কাবাব আর তন্দুরীর পসরা সাজিয়ে বসেছিল।

এই দোকানের বিশেষত্ব হলো লাইভ বার্বিকিউ, আপনার কাজ হলো শুধু মেনু দেখে অর্ডার দিন আর চোখের সামনে হতে দেখুন আপনার পছন্দ করা চিকেনের আইটেমটি। ডেভিডের দোকানে মেনুতে মারাত্মক ভ্যারিয়েশন না থাকলেও যা আছে তাতে দিব্যি চলে যাবে আর দাম একদম নাগালের মধ্যে। অর্ডার দেওয়ার আগে মেনুতে কি কি রেখেছে ডেভিড সেটা দেখে নিলাম, রোস্টেড চিকেন উইংস প্রতি পিস ২৫ টাকা, চিকেন লেগ তন্দুরী প্রতি পিস ছোট ৫০ টাকা আর বড় ৮০ টাকা, চিকেন সলিড পিস তন্দুরীও ৮০ টাকা, চিকেন টিক্কা কাবাব একটা শিক ৫০ টাকা (পাঁচ পিস থাকে), চিকেন পকোড়া ১০ টাকা পিস, এছাড়া লোটে মাছের ফ্রাই, ফিশ ফিঙ্গার, চিকেন ললিপপ সবেরই দাম ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। তবে আমি যা দেখলাম কাবাব আর তন্দুরীর বাইরে বাকি আইটেমগুলোর চাহিদা সেরকম নেই।

ভারতে লাইভ কাবাব আর তন্দুরীর কাউন্টারসহ রোস্টেড কার্টের কনসেপ্ট নতুন না হলেও কলকাতায় এখনো নতুন। আমার চেনা পরিচিতির মধ্যে আছে কসবা বকুলতলার দেবাংশু দে ও সোমা দে-এর ‘রোস্টেড কার্ট’। যদিও আমার এখনো গিয়ে ওঠার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু ওনাদের রোস্টেড কার্ট-এর ভ্যারিয়েশন বেশী আর দাম সামান্য বেশী হলেও শুনেছি খাবার নাকি দারুণ। উত্তর কলকাতা বা তৎসংলগ্ন এলাকায় এইরকম রোস্টেড কার্ট আগে দেখিনি, ডেভিডকে ধন্যবাদ এই উদ্যোগের জন্য।

মেনু দেখে একটা রোস্টেড চিকেন উইংস আর একটা চিকেন লেগ তন্দুরী অর্ডার দিলাম। এই ফাঁকে ডেভিডের সাথে গল্প জুড়লাম, কথায় কথায় জানলাম আগে আর্সালানে অনেকদিন কাজ করার পর একসময় নিজের স্টার্টআপের কথা ভাবতে শুরু করে আর সেখান থেকেই এই কাজের শুরু। ডেভিডের প্ল্যান ছিল কাবাব আর রোস্টেড চিকেন সবাই যাতে খেতে পারে আর তাদের পকেটেও চাপ যাতে না পরে। সেইজন্যই কোয়ালিটির সাথে আপোষ না করেও এই দামের মধ্যে কাবাব আর তন্দুরী বানাচ্ছে। আরো নিজের এইকাজ নিয়ে নানারকম পরিকল্পনার কথা বলল ডেভিড, এরই মাঝে রোস্টেড চিকেন উইংস আর চিকেন লেগ তন্দুরী চলে এল মশলা ও স্যালাড সহযোগে। দুটি আইটেমই জাস্ট দারুণ ছিল, নুন যথাযথ, রোস্ট একদম পারফেক্ট আর সাথে ছিল সেই স্মোকি ফ্লেভার। উপরের ঝলসানো মাংসের পরত-এর তলায় রয়েছে সাকুলেন্ট আর তুলতুলে মাংসের বাকি স্তরগুলো আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার প্রতিটা জিনিস একদম ফ্রেশ। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ধীরে সুস্থে খাওয়া দাওয়া শেষ করলাম। পেটের গোলিয়াথ ততক্ষণে ডেভিডের তন্দুরী চিকেন খেয়ে হার মেনেছে। সব মিলিয়ে আমার ৭৫/- টাকা হলো, ইচ্ছা তো করছিল বাকি আইটেমগুলোও চেখে দেখার, কিন্তু অন্যদিনের জন্য সেগুলোকে রেখে দিলাম।

খাওয়াদাওয়ার পালা চুকিয়ে ডেভিডকে গোলিয়াথ প্রমিস করে গেলো আবার আসার। ওদিকে এই ৯-১০ ডিগ্রী ঠাণ্ডায় জ্বলন্ত বার্বিকিউটার সামনে দাঁড়িয়ে যা আরাম হচ্ছিল সেটা ছিল রোস্টেড চিকেন উইংস আর চিকেন লেগ তন্দুরীর সাথে উপরি পাওনা। ব্যস্ আর কি এই ছিল ২০১৯-এর ডেভিড ও গোলিয়াথের কাহিনী। আপনারাও নাগেরবাজার চত্বরে বিকেল বা সন্ধের দিকে থাকলে ঢুঁ মারতেই পারেন ডেভিডের রোস্টেড কার্টে, আশা করছি খারাপ লাগবে না। কাবাব খেয়ে ভালো লাগলে না হয় মগনলালের মতন ‘নাজুক, নাজুক’ বলে উঠবেন আর খারাপ লাগলে নাহয় শুধু ছিঃ ছিঃ করবেন। তবে হ্যাঁ, হাতে সময় নিয়ে যাবেন, ভিড় বেশ ভালোই থাকে আর রোস্ট চলাকালীন তাড়া লাগাবেন না কারণ ভালো রোস্টেড চিকেন বানাতে সময় লাগে আর আচ্ছে দিনের জন্য যখন এতো বছর অপেক্ষা করলেন এইটুকু অপেক্ষাও করতে পারবেন।।

নভেম্বর রেইন আর সপ্তপদী

আজকাল বেশ ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়ের আগমন ঘটছে, তার অন্যতম কারণ হলো একের পর এক অরণ্য কেটে সাফ করা। অথচ এই অরণ্য আছে বলেই আমরা এখনো বেঁচে আছি, যেমন সুন্দরবন না থাকলে বুলবুল (সাইক্লোন) এর ধাক্কায় মোটামুটি লাখ পঞ্চাশেক মানুষ সাফ হয়ে যেতো। তাও যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটাও কিছু কম নয়। তো বুলবুলের প্রভাবে কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চল জুড়ে ছিলো অবিরাম বৃষ্টি, যাকে বলে নভেম্বর রেইন। এইরকমই বৃষ্টির দিনে আগে থেকেই যেহেতু অ্যাপয়ন্টমেন্ট করা ছিলো তাই বাবা আর বোনকে নিয়ে গেছিলাম একটা দরকারী কাজে গড়িয়াতে নাহলে বৃষ্টির দিনে আমি ল্যাদ খাওয়াটাকে বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকি। যাইহোক কাজটা হয়ে যাওয়ার পর তিনজনেরই ব্যাপক খিদে পেয়েছে, তো কোথায় যাওয়া যায় ভেবে নিয়ে ঠিক হলো বাঘাযতীনের সপ্তপদী-তে যাওয়া যাক। ঝমঝমে বৃষ্টি নিয়েই সপ্তপদী-তে ঢুকলাম, বাবার অনেক দিনের শখ বাঙালী খাবার খাবে আর এই ব্যাপারে সপ্তপদী বেশ ভালো। দরজা দিয়ে ঢুকতেই এক লহমায় চলে এলাম কৃষ্ণেন্দু আর রীনা ব্রাউনের পৃথিবীতে, ২০১৯ থেকে সোজা ১৯৬১। ছোট্ট কিন্তু ভালো করে সাজানো এই বাঙ্গালীয়ানা রেস্তোরাঁ, দেওয়াল জুড়ে গুরুদেব মানে উত্তম কুমারের আর সুচিত্রা সেনের সপ্তপদীর বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি। সপ্তপদী বাঙালীর খুব কাছের ছবি আর বাংলা সিনেমার অন্যতম মাস্টারপিস আর এই রেস্তোরাঁর প্রতিটা পদ শুনেছি দারুণ (কারণ তখনো খেয়ে দেখিনি)।

অর্ডার দিতে বসে প্রথমেই চোখ টানল মেনু কার্ডের কভারটা সেখানে লেখা: “অন্তহীন পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন কৃষ্ণেন্দু-রীনা। জীবনে বন্ধুর পথে চলতে গিয়ে সপ্তভূমিকায় অবতীর্ণা হয়েছিলেন তারাশঙ্করের রীনা ব্রাউন তাইতো সপ্তপদী। সেইরকমই একটা প্রয়াস নিয়ে তৈরি হয়েছে আমাদের ছোট্ট রেস্তোরাঁ সপ্তপদী। বর্ণে-গন্ধে-স্বাদে ভরা সপ্ত বৈচিত্র্যের অভিনব বাঙালী খাদ্য সম্ভার নিয়ে আমরাও চলতে থাকবো অন্তহীন পথে। কামনা করি আপনাদের আর্শীবাদ ও শুভেচ্ছা।”

এরপর চলল অর্ডার অভিযান। প্রথমেই এলো আম পোড়ার শরবত, এটা আমরা যে কোনো জায়গায় পেলেই অর্ডার দিই। তারপর সাদা ভাত, পোলাও, পোস্তর বড়া, মটরশুঁটি নারকেল দিয়ে মুগ ডাল, মোচার ঘন্ট, ভেটকি রসুন পাতুরি, ডাব চিংড়ি আর চিতল কালিয়া। অর্ডার করার দশ মিনিটের মধ্যে একে একে সবাই হাজির হলো। ভাত আর পোলাও নিয়ে কিছু বলার নেই, বেশ ভালো, পোস্তর বড়া মোটামুটি, আহামরি কিছু নয়। পোস্তর কেজি প্রায় ১৫০০টাকা আর এই বড়া প্রতি পিস ২০টাকা, তো সেই অনুযায়ী যতোটা পোস্ত দেওয়া যায় আর কি। মটরশুঁটি দিয়ে মুগ ডালটা দারুণ ছিলো তবে সেরার সেরা মোচার ঘন্ট, যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি অসাধারণ স্বাদ। আসলে ভালো মোচার ঘন্ট বানাতে গেলে তিনটে জিনিস অপরিহার্য, প্রথম উন্নত মানের মোচা, দুই নিখুঁতভাবে মোচা ছাড়াতে জানা কাউকে এবং তৃতীয় হলো মোচার ঘন্ট খাওয়ার জন্য কোনো পারফেক্ট স্বাদকোরকওয়ালা কোনো ব্যক্তি। চৈতন্যচরিতামৃতে লেখা আছে ঘি দিয়ে মোচার ঘন্ট চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম প্রিয় পদ ছিলো আর স্বামী বিবেকানন্দ মোচার ডালনার জন্য পাগল ছিলেন। আজকাল দেখি মোচা কেটে প্যাকেট করে বিক্রি হয়, ছোটবেলায় মাকে দেখেছি ধৈর্য্য ধরে মোচা ছাড়াতে, আমিও শখ করে একটা দুটো ফুল ছাড়াতাম। সপ্তপদীর মোচার ঘন্ট আমায় মায়ের হাতের মোচার ঘন্টর কথা মনে করিয়ে দিলো।

এরপর মনোযোগ দিলাম বাঙালীর সবসময়ের প্রিয় পদ ভেটকির পাতুরিতে। পারফেক্ট ভেটকি পাতুরি বানানো একটা শিল্প, যখন সরষে,কাঁচা লঙ্কা ও নারকেল দিয়ে তৈরি পাতুরির তুলতুলে মাছটা জিভে দিলেই টুক করে মিলিয়ে যায় আর সাথে থাকে সরষে-কাঁচা লঙ্কার ঝাঁঝের একটা হালকা শক্, তখন মনে আসে একটাই লাইন ‘এই পাতুরি যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো…. ‘। ভেটকি পাতুরি খেতে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি, দরকার হলে মাটন সরিয়ে রাখব, একটা বিয়েবাড়িতে সাতটা ভেটকি পাতুরি খাওয়ার পর আমার চক্ষুলজ্জা হয়েছিল। সপ্তপদীর ভেটকি পাতুরিও খেতে বেশ ভালো তবে অসাধারণ নয়।

আমি মাংসের থেকেও মাছ খেতে বেশী ভালোবাসি। তাই পাতুরি শেষ করেই আমরা ডাব চিংড়ি আর চিতল কালিয়াতে হাত লাগালাম। চিতল কালিয়াটা খেতে ব্যাপক যেহেতু কালিয়া তাই তেল-ঝাল-মশলাও বেশী তবে পোলাও এর সাথে খেতে মন্দ লাগেনি। মোচার ঘন্ট আগেই আমার মন ছুঁয়ে গেছিল কিন্তু সপ্তপদীর ডাব চিংড়ির সাথে জমাটি প্রেম হয়ে গেলো। উফফ উফফ কি খেতে ছিলো, না খেলে এ স্বাদ বোঝানো একটু মুশকিল। জাম্বো সাইজের চিংড়িগুলোর সাথে প্রতিটা উপাদান সঠিকভাবে মিশে ছিলো, আমি তো পুরো চেটেপুটে খেলাম। এই ডাব চিংড়ির জন্য কেউ আমার থেকে কিছু চাইলেও আমি দিয়ে দিতে পারি।

এখানেই ভোজন পর্ব শেষ হতে পারতো, কিন্তু আমরা বাঙালী শেষ পাতে একটু মিষ্টি লাগে যার হালফিলের গালভরা নাম ডেসার্ট। সপ্তপদীর অন্যতম পপুলার ডেসার্ট হলো আইসক্রিম পাটিসাপটা, এটা একটা ফিউশন মিষ্টি, নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এখানে পাটিসাপটার ভেতরে ক্ষীর-নারকেলের পুরের বদলে ভরা আছে বাটার স্কচ আইসক্রিম, এটার সাথে আমরা নিয়েছিলাম গন্ধরাজ ক্যারামেল কাস্টার্ড। যদিও আমার এই কাস্টার্ডটা ভালো লাগেনি, তবে আইসক্রিম পাটিসাপটা ব্যাপক ছিলো।

এইখানেই থামতে হলো আমাদের কারণ পেটে আর বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। সপ্তপদীতে খাবারের দাম ঠিকঠাক, মোটামুটি ১৫০০ টাকায় তিনজনের আরামসে খাওয়া হয়ে যাবে (আমাদের মোট ১৬৫০ টাকা হয়েছিল) আর খাবারের গুণগত মান ও স্বাদ বেশ ভালো। সবচেয়ে ভালো সপ্তপদীর অ্যামবিয়েন্স ছিমছাম কিন্তু আকর্ষণীয়, মানে একটা স্নিগ্ধতা আছে, তাই একাধিকবার এখানে আসা যায়।

খাওয়া শেষ করে এবার বেরোনোর পালা, কিন্তু মনটা মুখশুদ্ধি চাইছে। সপ্তপদী ছিলো দুটো মানুষের মনের গল্প তাই মনের কথা রেস্তোরাঁ সপ্তপদী বুঝবে এটা অনুমেয়, দেখি একটা রেকাবিতে তিনটে মিষ্টি পান হাজির। মিষ্টি পানটা মুখে দিতেই নিজেকে উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার বাবু মনে হচ্ছিল, যে হোটেল থেকে বেরিয়েই ঘোড়ায় টানা জুড়ি গাড়িতে উঠবে। বাইরে বেরিয়ে দেখি সেই একইভাবে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, ক্যাব আসতে আসতে হালকা ভিজেও গেলাম আমরা। ফেরার সময় গানস্ অ্যান্ড রোসেস-এর নভেম্বর রেইন শুনতে শুনতে গাড়ির বন্ধ কাঁচের মধ্যে দিয়ে বৃষ্টিভেজা কলকাতাকে খুব মোহময়ী লাগছিল আসলে পেট ভর্তি থাকলে অনেককিছুই সুন্দর লাগে আর সেই খাবার যদি সপ্তপদীর হয় তো কথাই নেই। নভেম্বর রেইন গানের কিছু কিছু অংশের সাথে অজান্তেই কৃষ্ণেন্দু আর রীনা ব্রাউন-এর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে, তাই লেখাটা শেষ করবো নভেম্বর রেইন দিয়েই……

When I look into your eyes
I can see a love restrained
But darlin’ when I hold you
Don’t you know I feel the sameNothin’ lasts forever


And we both know hearts can change
And it’s hard to hold a candle
In the cold November rain

২৪/১১/২০১৯

© কলকাতার_এক_কলমচি

দেবীপক্ষের সাতকাহন: ১ম

গাড়িটা পার্ক করতে করতে স্কুলের গেটের বাইরে অদিতিকে দেখতে পেল অভিষেক। মাথাটা নীচু করে দাঁড়িয়ে একমনে কিছু ভেবে চলেছে। স্কুল চত্বর প্রায় ফাঁকা, অফিসে বসকে ম্যানেজ করে আসতে একটু দেরীই হল অভিষেকের। গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে অদিতির সামনে দাঁড়ালো সে। মুখ তুলে তাকালো অদিতি, বড় বড় চোখগুলো ছলছল করছে। অভিষেক মাথায় হাত রাখতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরল ক্লাস সিক্সের অদিতি আর অস্ফুটে বলল, “বাবা, এবারেও রেজাল্ট ভালো হয়নি”।

স্মিত হেসে অভিষেক বলল, ” তাতে কি হয়েছে… “

“মা, ঠাম্মি, দাদুন আবার তোমার সেইসব কথা বলবে আর তোমাকেও আমার জন্য অনেক বকাবকি করবে”, প্রায় কান্না আটকে বলল অদিতি।

” ঐসব নিয়ে তুই ভাবিস না, ও আমি সামলে নেবো, আজ যেন আমাদের কি প্ল্যান ছিল?”

একটু অবাক হয়ে অদিতি বলল, “বাবা, আজ তুমি আর অফিসে ফিরবে না?”

বেশ জোর দিয়ে অভিষেক বলল, “আমি ছুটি নিয়ে এসেছি ডার্লিং। আজ বাকি দিনটা শুধু তোর সঙ্গে থাকবো।”

ভ্রূ কুঁচকে অদিতি বলল,”বাবা, আর ইউ শিওর? তোমার টাকলু বস্‌ তো  ফোন  করে ভিডিও কল করে বকাবকি করবে”।

“১০০% শিওর মাই ডিয়ার, প্রথমে আমরা যাবো তোর গিটার কিনতে, সেখান থেকে যাবো চায়না টাউন তোর প্রিয় চাইনিজ খেতে।” বলল অভিষেক।

মিষ্টি করে হেসে অদিতি বলল,” আই লাভ ইউ বাবা, তুমি আমার সুপারহিরো”।

গাড়ির দিকে যেতে যেতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অভিষেক দেখল, স্ত্রী অনন্যার মিসড কল আর বসের একটা টেক্সট ‘কাম শার্প, অনেক কাজ বাকি আছে’। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল সে আর পরক্ষণেই কি মনে হতে মোবাইলটা সুইচ অফ করে দিল। 

গাড়ি চালাতে চালাতে এটা ভেবেই অভিষেক স্বস্তি পাচ্ছিল মেয়ে ঠিক যে ভাবে বাঁচতে চায় ওকে ঠিক সেইভাবেই বাঁচতে দেয় অভিষেক। নিজের ছোটবেলার কথা ভাবলে কান্না দলা পাকিয়ে যায় গলার কাছে। একবার দুম করে ক্লাস ফাইভের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় প্রথম হয়ে গেছিল সে আর তারপর থেকে প্রথম হওয়ার যুদ্ধে ওকে নামিয়ে দিয়েছিল ওর বাবা-মা, নিজেও সেই নেশায় বুঁদ হয়ে কখন যে নিজের শৈশবটাকে মেরে ফেলেছিল বুঝতেই পারেনি। সেই শুরু আজও ওর জীবনের চাবিটা কখনো অনন্যার হাতে, কখনও বা বস্‌ মিঃ লাহিড়ীর হাতে আবার কখনো ওর বাবা-মা-এর হাতে। হাঁপিয়ে ওঠা এই জীবনে অদিতি হল অভিষেকের একমুঠো সতেজ হাওয়া। অদিতি যেদিন জন্মালো সেদিনই ঠিক করেছিল অভিষেক, মেয়েকে বড় হতে দেবে ওর নিজের ইচ্ছায়। লেখাপড়া যেরকম করার ঠিক করবে, অভিষেক জানে আজকাল খারাপ রেজাল্ট মানেও ৮০%, সেটা অদিতি এমনিই পায়। মেয়েকে স্বাধীনতা দেওয়া নিয়ে অনন্যা এবং বাকি আত্মীয়দের বক্রোক্তি বাপ-মেয়ে দুজনকেই হজম করতে হয়, কিন্তু তাতেও সে অনড়। 

অদিতির ডাকে সম্বিৎ ফিরল ওর। “বাবা, ওটা কি ফুল?” রাস্তার ধারে ফুলের ভারে নুয়ে পড়া একটা বড় ছাতিম গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে রেখেছে সে।

“ওটা তো ছাতিম ফুল, তুই চিনিস না?”মেয়েকে শুধাল অভিষেক। দুদিকে মাথা হেলিয়ে না বলল সে।

“চাই না কি তোর ঐ ফুল? এটা কিন্তু শুধু দুর্গাপুজোর সময়েই পাবি”।

“তাহলে তো এটা স্পেশাল ফুল বাবা?!”

‘হ্যাঁ! তা বলতে পারিস। এর গন্ধটাও কিন্তু ভীষণ অন্যরকম”।

মেয়ের সাথে কথা বলতে বলতেই গাড়িটা রাস্তার ধারে সাইড করল অভিষেক। বাপ-মেয়ে দুজনে ছাতিম গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল, ওদিকে আকাশ কালো মেঘে ভর্তি হয়ে গেছে। 

‘বাবা কি দারুণ গন্ধ!!” অবাক হয়ে বলল অদিতি

একটু উঁচুতে একটা ডালের গোড়ায় এক থোকা টাটকা ছাতিম ফুল। অদিতির আব্দারে অনেক কষ্টে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বার পাঁচেকের চেষ্টায় সেই ফুল পাড়তে সক্ষম হল অভিষেক। পথচলতি মানুষজন অবশ্য বাপ-মেয়ের এই কাণ্ড দেখে হয় অবাক না হয় ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে এগিয়ে গেল। ছাতিম ফুলের থোকাটা নিয়ে প্রাণভরে গন্ধ শুঁকল অদিতি। মেঘ গর্জনের সাথে এক-দু ফোঁটা বৃষ্টিও শুরু হল।

‘চল, এবার যাওয়া যাক, মনে হচ্ছে এবার পুজোয় বেশ বৃষ্টি হবে”, বলল অভিষেক।

অদিতি বলল,” না বাবা, কাল তো মহালয়া, আমি এই স্পেশাল ছাতিম ফুল নিয়ে কাল মা দুর্গাকে রিকুয়েস্ট করবো যেন পুজোর দিনগুলোয় বৃষ্টি না হয় আর আমরা অনেক ঘুরতে পারি, কিন্তু বাবা তুমি ছুটি পাবে তো?”

মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে অভিষেক বলল, “তোর জন্য পুজোর পাঁচদিন ছুটি নেবো। কাল তো মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু আর দেবীপক্ষে কেউ খারাপ থাকে না। সবাইকে ভালো রাখতেই তো মা দুর্গা প্রতিবছর আসেন”।

“জয় মা দুর্গা!” বলে আনন্দে লাফিয়ে উঠল অদিতি আর ওদিকে মেঘ কেটে রোদের ফালিও ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে।

সমাপ্ত    

#কলকাতার_এক_কলমচি 

 

এক ঈশ্বরের কাহিনী

আমার বোন বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্রী ছিল, ওকে বরাবরই দেখতাম কলেজ নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ওর মধ্যে আছে। আজও দেখি নিজের কলেজ নিয়ে বলতে গেলে শ্রদ্ধায় আত্মমগ্ন হয়ে পড়ে, দুঃখও করে যে কাজের চাপে কলেজে একবার ঘুরে আসার সময় করতে পারেনা বলে। কাল আমায় হঠাৎ বলল, “দাদা, পরশু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন”। আমার বোন চারপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সমন্ধে ওয়াকিবহাল থাকলেও খুবই কমসময় কোনো ব্যাপারে রিঅ্যাক্ট করে। এহেন শান্ত মানুষটাকে আমি ভীষণভাবে রাগতে ও মর্মাহত হতে দেখেছিলাম যখন একদল দুষ্কৃতি এই বছরের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে ভাঙচুর চালায় ও বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভেঙ্গে দিয়ে যায়। কিন্তু যতই মূর্তি ভাঙ্গা হোক মানুষের মন থেকে তো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবছি মানুষটার মধ্যে তাঁর কাজের মধ্যে এমনই কিছু ছিল এবং তিনি আজও এতোটাই প্রাসঙ্গিক যে আঠারোশো শতকের আর এই একবিংশ শতকের বাঙালী তথা হিন্দু নারীসমাজ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০০তম জন্মদিবস, সেই ২০০ বছর আগে মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর লড়াই, আজও সেই লড়াই একইভাবে চলছে।

কুসংস্কার আর কূপমণ্ডকতার স্তুপ আমাদের সমাজকে বরাবরই মুমূর্ষু করে রেখেছে, ১৮২০ সালেও যা ছিলো এখনও তাই আছে শুধু ধরনটা বদলেছে। সেই যুগে মেয়েদের শিক্ষাগ্ৰহণ নিয়ে বিস্তর কুসংস্কার ছিলো, আজ প্রায় ৬৭% ভারতীয় নারী শিক্ষিত হলেও সরকারকে আজও সর্বশিক্ষা অভিযান বা মিড ডে মিলের কর্মসূচি দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করতে হচ্ছে কারণ আমাদের দেশের সরকারের ‘মডেল স্কুল’ সমন্ধে কোনো সঠিক চিন্তাভাবনা কোনোদিনই ছিলো না। কিন্তু আজ থেকে ১৭০ বছর আগে বিদ্যাসাগর শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আধুনিক ও পরিকল্পিত ভাবনার অবতারণা করেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণকে করে তুলেছিলেন সহজবোধ্য, লিখেছিলেন সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা। যদিও নিজের শিক্ষা বিস্তারের ভাবনা তিনি বই আকারে লিখে যাননি কিন্তু বহু শিক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্ট ও সরকারি চিঠি থেকে সেগুলো জানা যায়। ইংরেজি শিক্ষার বিরোধ না করেও বাংলা ভাষাকেই তিনি শিক্ষা বিস্তারের প্রধান মাধ্যম করে তোলেন। তিনি রচনা করলেন বর্ণপরিচয়, আমাদের সকলের জীবনের প্রথম পাঠ্যপুস্তক, নিরলসভাবে লিখেছেন একের পর এক সহজবোধ্য পুস্তক যা বাংলা ভাষার এক একটা মণি-মানিক্য।

১৮১৫ সাল থেকেই খ্রীষ্টান মিশনারীরা এদেশে নারীশিক্ষার সূচনা করেছিলেন। এনারাই ১৮১৯ সালে ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন।গৌরীবেড়ে, নন্দবাগান, জানবাজার ও চিৎপুর এলাকায় ছিল এই সোসাইটির বালিকা বিদ্যালয়। আমরা অনেকেই হয়তো মিস ম্যারি অ্যান কুক-এর নাম জানিনা। ১৮২১ সালে চার্চ মিশনারী সোসাইটির উদ্যোগে নারীশিক্ষার প্রসারে তিনি কলকাতা আসেন এবং একবছরের মধ্যে আটটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই স্কুলগুলি ছিল: ঠনঠনিয়া স্কুল, মির্জাপুর স্কুল, প্রতিবেশী স্কুল, শোভাবাজার স্কুল, কৃষ্ণরাজার স্কুল, মল্লিকবাজার স্কুল, শ্যামবাজার স্কুল ও কুমোরটুলি স্কুল। ১৮২৭ সালের মধ্যে বিদ্যালয় সংখ্যা ২৫ এবং ছাত্রীসংখ্যা প্রায় ৪০০ ছুঁয়ে ফেলে।

সালটা ১৮৪৯, জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন বা আমরা যাকে বেথুন সাহেব বলেই চিনি, কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন মেয়েদের জন্য স্কুল, নাম হলো ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল আর লোকমুখে বেথুন সাহেবের স্কুল। এই স্কুল স্থাপনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জী, রামগোপাল ঘোষ এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কার বেথুন সাহেবকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। এই স্কুলে বাংলা ভাষা শেখানোতেই বেশী জোর দেওয়া হতো। দূর থেকেও অনেক ছাত্রী এই স্কুলে ভর্তি হওয়ায় বেথুন একটি ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করেন,এর ফলে ছাত্রীরা ঠিক সময়ে স্কুলে উপস্থিত হত। বিদ্যাসাগর ঐ ঘোড়ার গাড়ির গায়ে খোদাই করেছিলেন এক শাস্ত্রবচন: কন্যাপেবং পালনীয়া শিক্ষাণীয়াতি যত্নতঃ। এর অর্থ ছিল পুত্রের মতো করে কন্যাকেও যত্ন করে পালন করতে ও শিক্ষা দিতে হবে। ১৮৫১সালের অগাস্ট মাসে আচমকাই বেথুন সাহেবের মৃত্যু হলে বিদ্যাসাগরমশায় স্কুলের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ততদিনে অবশ্য গোঁড়া হিন্দু সমাজ নারীশিক্ষা নিয়ে নিজেদের মানসিক সংকীর্ণতা প্রকাশ করে ফেলেছে যেরকম মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তাহলে তাদের জাত যায় বা তারা বিধবা হয়ে যাবে। বাঙালি উচ্চসমাজ অবশ্য নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও সেই কথা তুলে ধরার সদিচ্ছা তারা দেখিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এই বেঁটেখাটো চেহারার মানুষটার দুর্ভেদ্য দৃঢ়তা নারীশিক্ষার পথে আসা সমস্ত বাধাকে ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলতে লাগলো।

১৮৫৫ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার সরকারি খরচে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে উৎসাহী হয় এবং মডেল স্কুল বানানোর দায়িত্ব সপেঁ দেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাতে। কর্মোদ্যোগী বিদ্যাসাগর ১৮৫৭-১৮৫৮ এই দু’বছরে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, সবচেয়ে বেশী ২০টি বালিকা বিদ্যালয় খোলা হয় হুগলী জেলায়, এছাড়া বর্ধমানে ১১টি, মেদিনীপুরে ৩টি ও নদীয়াতে একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এই বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০০ এবং মাসিক খরচ ছিল ৮৫০টাকা। রমরমিয়ে বিদ্যালয়গুলো শুরু হলেও সেইসময় দেশজুড়ে শুরু হয় ‘সিপাহী বিদ্রোহ’, এর ফলে ব্রিটিশ রাজকোষাগারে মন্দা দেখা দেয়, ফলে তারা বিদ্যাসাগরমশায়কে জানিয়ে দেয় বালিকা বিদ্যালয় বাবদ কোনো খরচ সরকার আর বহন করবেন না। এদিকে সমস্ত শিক্ষকদের বেতন তখনও বাকি, বিদ্যাসাগর সরকারকে অনেক চিঠিপত্র লিখে অবশেষে শিক্ষকদের বেতনের টাকা আনাতে সক্ষম হলেও বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য কোনো খরচ করতে আর তারা রাজি হল না। কিন্তু বিদ্যাসাগর সহজে হেরে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না, তাঁর দুর্দমনীয় জেদ তাঁকে বাল্যকাল থেকেই প্রতি পদক্ষেপে লড়াই করতে শিখিয়েছিলে। তিনি নিজের সমস্ত কিছু বিলিয়ে দিয়ে আর বিভিন্ন চেনাজানা মানুষের থেকে ঋণ নিয়ে বিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন, ঋণভারে জর্জরিত হলেও নারীশিক্ষার প্রসার তিনি বন্ধ হতে দেননি।

আমরা সকলেই সুপারহিরোদের সিনেমা দেখতে ভালবাসি, অনেকে ভাবেন এইগুলো যদি সত্যি হত, কিন্তু দিনের শেষে এটা আমাদের মানতেই হয় যে এই চরিত্রগুলো কাল্পনিক। কিন্তু উনবিংশ শতকের ভারতবর্ষ পেয়েছিল রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে দুই রক্তমাংসের সুপারহিরোকে, যাদের সুপার পাওয়ার ছিল সৎসাহস, কালোপযোগী পাণ্ডিত্য আর অঢেল ও নিখাদ নিষ্ঠা। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারও দরকার, তাই তো তিনি বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন এবং রীতিমতো আইন করে চালু করলেন বিধবা বিবাহ। বাংলার হাজার হাজার গোঁড়া রক্ষণশীল হিন্দু বলার অযোগ্য ভাষায় সেইসময় বিদ্যাসাগরকে আক্রমণ যেমন করেছিলেন তেমনি কয়েকশো বাল্যবিধবা ও অত্যাচারিত নারীরা প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলেন তাঁকে। বিদ্যাসাগরের জীবনে সবচেয়ে বেশী প্রভাব ছিল তাঁর মা ভগবতী দেবীর,বিধবাবিবাহ চালু হওয়ায় যিনি সবচেয়ে বেশী খুশী হয়েছিলেন। আজ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষ শুরু হলো, মাঝে মাঝে ভাবি আজ যদি বিদ্যাসাগরমশায় জন্মগ্রহণ করতেন না জানি কতো লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হতো, হয়তো তাঁকে বিভিন্ন কদর্য উপাধিতে ভূষিত করত বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো। কারণ বর্তমানে আমরা প্রতিমুহূর্তে মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি, ক্রমশ অবক্ষয় হচ্ছে যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনার। লেখাটা শেষ করবো পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা কবিতা দিয়ে:

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
ভীষণ বাজে লোক
বলত কিনা বিধবাদের
আবার বিয়ে হোক।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
দেখতে এলে বেলে
চাইতো কি না লেখাপড়া
শিখুক মেয়ে ছেলে।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
দেমাকধারী ধাত
সাহেব যদি জুতো দেখায়
বদলা তৎক্ষণাৎ।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
বুদ্ধি শুদ্ধ কই
লিখেই চলে লিখেই চলে
শিশুপাঠ্য বই।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
কপালে তার গেরো
ওষুধ দিয়ে বাঁচায় কিনা
গরীব-গুর্বোদেরও।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর
মগজটা কি ফাঁকা
যে যেখানে বিপন্ন তার
জোগানো চাই টাকা।


তথ্যসূত্র:
১. বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ: বিনয় ঘোষ
২. করুণাসাগর বিদ্যাসাগর: ইন্দ্র মিত্র
৩. Ishwar Chandra Vidyasagar: The champion educator of Bengal; Arnab Kumar Roy, The Research Journal of Social Sciences, November 2018,vol. 9

ছবি: ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।
২৬/০৯/২০১৯
©কলকাতার এক কলমচি

ডেকার্স লেন: কলকাতার হাউজকিপিং জিন

সময়টা এই বছরের জুন মাসের শেষদিক, সরকারি ভাবে বর্ষাকাল ঢুকে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা প্রকৃতির উপর খোদগারি করতে গিয়ে নিজেদেরকেই কখন শেষের পথে ঠেলে দিয়েছি বা প্রতিনিয়ত দিচ্ছি আর সেটা নিজেরা বুঝেও না বোঝার ভান করে রয়েছি। যাইহোক, প্রবল গরমে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা চারদিকে, আমি বি.বা.দী বাগের অফিস পাড়ায় একটা কাজে গেছিলাম। কাজ মিটতে মিটতে প্রায় একটা বেজে গেলো। এদিকে প্রবল খিদে পেয়েছে, পেট তো আর শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা মানে না। সকাল থেকে প্ল্যান করে রেখেছিলাম যে কাজ মিটিয়ে ডেকার্স লেনে চিত্তদার সুরুচি রেস্টুরেন্টে খাবো। কিন্তু বাইরে রোদের তেজ দেখে একটু দমে গেলাম, তারপর যা হবে দেখা যাবে এই মনোভাব নিয়ে ডেকার্স লেনের উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগালাম।

মিনিট পাঁচ-সাত হাঁটার পরে মনে হচ্ছিল আজ বোধহয় সান স্ট্রোক হয়ে মরেই যাবো। তাও পুরনো বাড়ি, দোকানের আশপাশ দিয়ে বা গাছের ছায়া দিয়ে যতটা সম্ভব রোদ বাঁচিয়ে চলতে থাকলাম। ডেকার্স লেন বা জেমস হিকি সরণী এক অদ্ভুত গলি, ভারতের প্রায় সব প্রদেশের খাবার আপনি পাবেন, খুঁজলে বোধহয় ডাইনোসরের ডিমও পাওয়া যাবে। ডেকার্স লেনের উত্তর দিকে ওয়াটার লু স্ট্রিট এবং দক্ষিণ দিকে এসপ্ল্যানেড রো। আজ থেকে ২০০ বছর মতান্তরে ২৫০ বছর আগে কলকাতায় ফিলিপ মিলনার ডেকার নামে একজন কালেক্টর ছিলেন। তিনি প্রায়ই এই চত্বরে আসতেন এবং নাবিকদের সাথে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে গল্প করতেন এবং শোনা যায় তিনি রীতিমতো রান্নার আসর বসাতেন। এই ফিলিপ মিলনার ডেকারের নাম থেকেই এই জায়গার নাম হলো ডেকার্স লেন।

এখন অবশ্য এর নাম পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন নাম ‘জেমস হিকি সরণী’। জেমস হিকিকে আমরা অনেকেই চিনি আবার অনেকেই চিনি না। ১৭৪০ সালে আয়ারল্যান্ডে জেমস অগাস্টাস হিকির জন্ম হয়। যুবক বয়সে তিনি ওকালতি, প্রিন্টিং এবং সার্জারি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৭৭২ সালে হিকি ভারতে এসে উপস্থিত হন, তার পনেরো বছর আগে পলাশীর যুদ্ধে জিতে ব্রিটিশরা বেশ জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। কলকাতায় এসে জেমস হিকির দিন মন্দ কাটছিল না, কলকাতা বন্দরে নিজের ব্যবসার কাজ করতেন। কিন্তু সময় সে ভালো হোক বা খারাপ একদিন বদলাবেই। হিকির ব্যবসাতেও লোকসান হলো আর ব্যবসা বাঁচানোর চক্বরে ধারদেনায় ফেঁসে গেলেন। এদিকে পাওনাদাররাও ছাড়বার পাত্র নয়, কিন্তু ধার শোধ করতে না পেরে অবশেষে ১৭৭৬ সালের অক্টোবর মাসে জেমস হিকির জেল হয়।

কথায় আছে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙে’, কারাগারে থাকাকালীন হিকি সাহেব একটা প্রিন্টিং মেশিন ও প্রিন্টিং প্রেস চালানোর দরকারী জিনিস জোগাড় করে জেলে থেকেই প্রিন্টিং-এর কাজ শুরু করলেন। ১৭৭৮সালে জেল থেকে মুক্তিলাভ করে প্রিন্টিং-এর কাজ নিয়ে আরো সিরিয়াস হয়ে পড়েন জেমস হিকি।

বি.বা.দী বাগ থেকে ডেকার্স লেন হেঁটে বারো থেকে পনেরো মিনিট লাগে, কিন্তু বীভৎস গরমে সেটা প্রায় আধঘণ্টা লাগার সমান। পকেটের রুমাল দুটো ঘাম মুছে মুছে এক একটা প্রায় পাঁচশো গ্ৰাম ওজন হয়ে গেছে। একজন ফল বিক্রেতাকে দেখলাম খবরের কাগজটাকে হাত পাখা বানিয়ে জোরে জোরে হাওয়া খাচ্ছে আর মাঝে মধ্যে ফলে বসা মাছিও তাড়াচ্ছে। এই খবরের কাগজ বা সংবাদপত্রের চক্বরেই জেমস হিকি জেল থেকে বেরিয়েও নিজের জীবনে শতেক অশান্তি আমদানি করেছিলেন।

জেমস হিকিকে বলা হয় ‘Father of Indian Journalism’ এবং ওনার হাত দিয়েই ১৭৮০ সালের ২৯শে জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল এশিয়ার প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র ‘হিকিস্ বেঙ্গল গেজেট (Hicky’s Bengal Gazette)’ বা ‘দ্য অরিজিনাল ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইসার (The Original Calcutta General Advertisor)’। হিকির বেঙ্গল গেজেট ছিল দু’পাতার কিন্তু এই দু’পাতায় রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক খবর, কলকাতার ভালো মন্দের খবর, মহিলাদের জন্য আলাদা কলাম, বিজ্ঞাপনসহ প্রায় সবকিছুই। হিকির বেঙ্গল গেজেটের মূল কথা ছিল ‘Open to all parties, but influenced by none’। প্রতি সপ্তাহে দুশো বা কখনো তার বেশী কপি বিক্রি হতো। কলকাতায় থাকি বলে বলছি না, এই শহরে যেই আসুক কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলে, শহরের সুখ-দুঃখের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। জেমস হিকির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি, তাঁর গেজেটের প্রতি সংখ্যায় থাকতো কলকাতার ভালো মন্দ নিয়ে একটা প্রবন্ধ। সেইসময় গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস যার মতো দুর্নীতিপরায়ণ লোক পাওয়া দুষ্কর। বেঙ্গল গেজেটের মাধ্যমে কলকাতা শহরের রাস্তা তৈরি ও তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, শহরের নবনির্মাণ, জনসাধারণের জন্য শৌচাগার নির্মাণ, শহরের সুরক্ষা প্রভৃতি নিয়ে জেমস হিকি ধীরে ধীরে তুলে ধরেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদাসীন্য ও বিভিন্ন দুর্নীতি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হিকিকে বিভিন্ন জাঁতাকলে ফেলার চেষ্টা করলেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে তিনি লড়ে গেছিলেন। ১৭৮১ সালের জুন মাসে হেস্টিংসের নির্দেশে হিকির জেল হয় এবং ১৭৮২ সালের ২৩শে মার্চ পাকাপাকিভাবে বেঙ্গল গেজেটের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

এইসব ভাবতে ভাবতে ডেকার্স লেনে ঢুকে পড়লাম। খিদের চোটে আর এদিক-ওদিকে না তাকিয়ে সোজা চিত্তদার সুরুচি রেস্টুরেন্টে। প্রায় ৬৫ বছরের পুরনো এই দোকানের ঠিকানা ২, ডেকার্স লেন। ১৯৪০ সালে চিত্তরঞ্জন রায় যিনি আমাদের কাছে চিত্তদা নামে পরিচিত ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতায় এসে উপস্থিত হন আর তারপরেই এই দোকানের যাত্রা শুরু। এখন চিত্তদার তৃতীয় জেনারেশন সন্দীপ রায় ব্যবসা সামলাচ্ছেন। চিত্তদার আদি দোকানটা আগের মতোই আছে আর সুরুচি রেস্টুরেন্ট হালফিলের। ওতো গরমেও সুরুচি রেস্টুরেন্টে বেশ ভালোই ভীড় ছিলো, একটা ফাঁকা টেবিল দেখে বসলাম। এখানে সব টেবিলের সাথে চারটে করে চেয়ার রয়েছে এবং আপনাকে অপরিচিত কারুর সাথে টেবিল শেয়ার করে নিতে হবে। মধ্যাহ্নভোজের সময় একটা টেবিলে একা বসে খাওয়া এখানে দিবাস্বপ্ন বইকি। যেমন আমার উল্টোদিকে একই টেবিলে আরো দুজন ভদ্রলোক এসে বসলেন। মোটামুটি সব টেবিলেই অচেনা, অজানা লোকজন একসাথে তৃপ্তি করে বসে নিজেদের খাওয়া সারছে। এখানে কোনো মেনুকার্ড নেই কিন্তু দেওয়াল জোড়া ঢাউস একটা মেনু বোর্ড আছে, তাতে সর্বমোট ৪৬টা পদের নাম ও দাম লেখা আছে। পুরো মেনু বোর্ডটা দেখে আমার মতো আপনারাও স্বস্তি পাবেন, কারণ দাম একদমই আয়ত্তের মধ্যে, তবুও যদি কারুর দাম বেশী মনে হয় খাবারের পরিমাণ দেখে আপনার সব ভুল ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। সবথেকে কম দামী খাবার সাত টাকা আর সবচেয়ে দামী খাবার ১৮০টাকা মাত্র।

আমি দুটো রুমালী রুটি আর এক প্লেট চিকেন ভর্তা অর্ডার দিলাম। তপ্তজ্বলন্ত গরমে এর থেকে বেশী খাওয়ার রিস্ক নিতে পারিনি। অর্ডার দেওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যেই দুটো তুলতুলে রুমালী রুটির সাথে এক প্লেট ঠাসাঠাসি চিকেন ভর্তা এসে উপস্থিত হলো। চিকেন ভর্তার উপরে একটা পুরো সেদ্ধ ডিম দুভাগ করে দেওয়ায় ওকে আরো সুন্দরী লাগছিল। এক কুচি রুটি ছিঁড়ে তাতে চিকেন ভর্তা দিয়ে মুখে দিতেই গরমে এতোটা হেঁটে আসার ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে মুখের মধ্যে যেন উৎসব শুরু হল। স্যাক্রেড গেমসের গণেশ গায়তোণ্ডের ভাষায়, “মুহ মে দিওয়ালি হোরেলা থা শালা”।

একটা রুটি শেষ করে বুঝলাম বাকিটা শেষ করতে ভালোই লড়াই করতে হবে। ঐ যে বলছিলাম না পরিমাণ, যে পরিমাণ চিকেন ভর্তা দিয়েছিল আরামসে দুজনের টেনেটুনে তিনজনের হয়ে যাবে। ধীরে সুস্থে পুরো খাবার শেষ করে ১২২ টাকা বিল মিটিয়ে দোকানের বাইরে এলাম। এদের খাবারের সুখ্যাতি বহুদিন ধরেই শুনি কিন্তু আজ খেয়ে মন ভরে গেল। শুধু চিকেন ভর্তা নয়, চিত্তদার সুরুচির চিকেন স্টু, চিকেন রেজালা, ডায়মণ্ড ফিস ফ্রাই, কবিরাজী সমানভাবে জনপ্রিয়।

পেট ভরে খাওয়ার পর এবার ডেকার্স লেনকে এক্সপ্লোর করার সময়। ডেকার্স লেনের এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত হাঁটলে আপনি মোটামুটি সবরকম খাদ্যবস্তু পাবেন, তাতে বাঙালী, তন্দুরি, মোগলাই, চাইনিজ, দক্ষিণ ভারতীয়, গুজরাটিসহ প্রায় সকলেই আছে। চিত্তদার ডানদিকেই আছে আপনজন, এদের মেন দোকানটা সদানন্দ রোডে। এরা বিভিন্নরকম ভেজ ও নন-ভেজ কম্বো বিক্রি করলেও এখানকার খিচুড়ি খেতে বেশ ভালোই লাইন পড়ে, সাথে থাকে বেগুনভাজা, পাঁপড়ভাজা আর চাটনি। চিত্তদার বাঁদিকে আছে আর একটা দারুণ রেস্টুরেন্ট ক্লাসিক ফাস্টফুড। এদেরও সাংঘাতিক রকমের খাবারের বৈচিত্র্য আছে। তাই চিত্তদার বদলে ক্লাসিক যেকোনো দিন আপনার প্রথম পছন্দ হতেই পারে। এখানে বিরিয়ানি বা মশালা কুলচার সাথে মাটন কোর্মা বা চিকেন-মাটনের অন্য কোনো ডিশ ট্রাই করা যেতে পারে আর আপনি যদি ভেজ খেতে ভালোবাসেন তাহলে ডাল ফ্রাই, বাটার পনীর, পালং পনীর কিংবা রাজমা কারী।

এইসবের বাইরেও যদি আপনার অন্য কিছু খেতে মন চায় তাহলে চলে যান বেবো স্যাণ্ডউইচ-এ, না এটা কোনো নামকরা ক্যাফে নয়, একটা ছাতার নীচে একটা ছোট্ট টেবিলে এই স্যাণ্ডউইচ কর্নার। এখানে গ্রিলড করা পাঁউরুটির মধ্যে খুব সাধারণ ফিলিং যেমন পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম, টমেটো ইত্যাদি উপকরণসহ এই স্যাণ্ডউইচ তৈরি করা হয়। এছাড়াও পুরী, সবজি, ভাত, দাল,মাছ, দই-ভাত, দই-চিঁড়ে, ইডলি, ধোসা, ধোকলা, রোল, চাউমিন এইসবের দোকান পুরো গলি জুড়ে পেয়ে যাবেন। ও হ্যাঁ ডেকার্স লেনের হাক্কা চাউমিন কিন্তু বেশ জনপ্রিয়, অনেককেই দেখলাম চাউমিন আর চিলি চিকেন বা চিলি পনীর দিয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে নিচ্ছেন।

দুপুরবেলাই হলো ডেকার্স লেনকে পরখ করার আদর্শ সময়, দুপুর একটা থেকে তিনটে অব্দি এই গলিতে তিলধারণের জায়গা থাকে না ফলে পুরো গলিটার এদিক থেকে ওদিক যেতে ভালোই বেগ পেতে হয়। ডেকার্স লেন আমায় প্রতিটা মুহূর্তে বিস্মিত করেছে, এই গলিতে ঢুকেই একটা চায়ের দোকান আছে , পাঠকদের জানিয়ে রাখি ডেকার্স লেনে গেলে এখানকার চা ভুলেও মিস্ করবেন না। কড়া লিকার, হালকা লিকার, অল্প চিনি, বেশী চিনি, প্রায় সবরকম চা আপনি এখানে পাবেন আর চা-এর পরিবেশনা হবে একদম খাতির করে সাদা ডিশের উপর সাদা কাপ বসিয়ে। এইরকমভাবে আমি আরো এক জায়গায় চা পরিবেশন করতে দেখেছি, সেটা যাদবপুরে। আপনি ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজির ফুটপাথ ধরে ৮বি এর দিকে এগোলেই এই চা বিক্রেতাকে দেখতে পাবেন। যাইহোক ডেকার্স লেনের এই দোকান থেকে এক কাপ চা আমিও নিলাম কারণ চা-এ না বলার মতো অপরাধ আমি করতে পারবো না।

অনেকেরই খাওয়ার পর মনে হয় একটু মিষ্টি হলে মন্দ হতোনা। চিন্তা নেই ডেকার্স লেন সেই ব্যবস্থাও করে রেখেছে, টুক করে চলে যান চিত্তদা আর আপনজন- এর মাঝের দোকানে, এদের লস্যি আর গাজরের হালুয়া বেশ ভালো খেতে।

মোটামুটি সমস্ত বিবরণ পাওয়া দিয়ে ফেললাম। কিন্তু ডেকার্স লেনে না এলে ডেকার্স লেনকে বোঝা যাবে না। এখানে কোনো আতিশয্যের বাহুল্য নেই, নেই উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তের ভেদাভেদ, আছে নড়বড়ে আদ্যিকালের বেঞ্চ, আছে রঙচটা মামুলি চেয়ার-টেবিল, আছে লোভনীয় খাবারের জন্য অপেক্ষা, আছে ভীড়ের মধ্যে প্লেটটাকে কায়দা করে ধরে খাওয়ার আনন্দ, আছে অচেনা কারুর পাশে বসে একসাথে খেতে খেতে তাঁর সাথে মামুলি আড্ডা, আছে দোকানীদের মন ভালো করা আন্তরিক ব্যবহার আর একরাশ ভালো টাটকা খাবার নূন্যতম দামে।

আমাদের চারপাশে আজকাল সবকিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে, জড় বস্তু থেকে সজীব বস্তু, মানুষ আর তার মনুষ্যত্ব সবকিছুই বদলাচ্ছে। কিন্তু তারমধ্যেও কিছু জায়গা বা কিছু জিনিস আজও একইভাবে বিরাজমান নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে। জেনেটিক্সে ‘হাউজকিপিং জিন’ সমন্ধে পড়েছিলাম, এইসব জিনেরা সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে সব কোষের(Cell) মধ্যে থাকে। খুব জরুরি কিছু সেলুলার ফাংশন-এর দ্বারা এইসব জিনরা কোষকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং সারাক্ষণ নিঃশব্দে যত্নসহকারে নিজেদের কাজ করে যায়। ডেকার্স লেনও অনেকটা হাউজকিপিং জিনের মতো যে যুগের পর যুগ পেরিয়েও একইরকমভাবে নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে এবং প্রত্যহ কয়েক হাজার মানুষের খাবারের জোগান দিয়ে চলেছে এই গলির বিভিন্ন দোকানগুলো। এই চকচকে দুনিয়ায় ডেকার্স লেন এইভাবেই থাকুক। ভালো থেকো ডেকার্স লেন, এখানে একবার এলে আবার আসতে হবে, আসতেই হবে।।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা

১. Andrew Otis, Hicky’s Bengal Gazette: The Untold Story of India’s First Newspaper, New Delhi: Westland Publications, 2018.

২. DACRES LANE- THE BLUE EYED BOY OF KOLKATA STREET FOOD- Indrajit Lahiri

ছবি: প্রথম তিনটে ছবি আমার তোলা বাকি ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।

©কলকাতার_এক_কলমচি

চিকেন ভর্তা
চিত্তদার আদি দোকান
মশালা কুলচা

বার্বিকিউয়ের দেশে: দ্বিতীয় পর্ব

“লা-জাবাব!, কাবাব পর্ব শেষ করে বাবার মুখ দিয়ে এই কথাটাই বেরিয়ে এলো। আমি বললাম, “কেমন লাগছে?” বেশ খুশি মনে বাবা বলল, “অতি উত্তম, যেমন সুন্দর জায়গা তেমনই সুন্দর খাওয়াদাওয়া”। বোন বলল, “কাবাব খেয়েই তুমি সার্টিফিকেট দিয়ে দিলে যে”। তবে এটা ঠিক বার্বিকিউ নেশানের ইন্টেরিয়র ডেকরেশান ছিমছাম হলেও বেশ নজরকাড়া আর এখানকার স্টাফেদের ব্যবহারও খুব ভালো। ইতিমধ্যেই মেনকোর্সের দিকে টুকটাক ভিড় হচ্ছে, আমিও প্লেট নিয়ে সেই দিকে হাত বাড়ালাম। ততক্ষণে কাবাবগুলো পেটের ভেতর নিজেদের প্লট বেছে নিয়ে সরে গেছে এবং জায়গা করে দিয়েছে বাকিদের জন্য।

মেনকোর্সের শুরুতেই ছিল চিকেন ফ্রায়েড রাইস আর সেজওয়ান চিকেন। চিকেন ফ্রায়েড রাইসটা দারুণ ছিল এবং বেশ অন্যরকম, অনেকদিন বাদে বেশ ভালো একটা ফ্রায়েড রাইস খেলাম। সেজওয়ান চিকেনটা ঠিকঠাক তবে চিকেনের পিসগুলো কাটতে কাটতে একটু বেশীই ছোট করে ফেলেছিল। এরপর ছিল দইমাছ, এটা আমার ভালোই লেগেছিল আর ছিল আকুরি। আকুরি আর কিছুই নয় স্ক্র্যাম্বেলড এগ ডিশ সাথে আদা, লঙ্কা, গোলমরিচ আরো বিভিন্ন উপাদান সহযোগে বানানো। এখানেই কিন্তু মেনকোর্সের শেষ নয়, আকুরির পরে ছিল পেশোয়ারী মুর্গ, বাটার নান, চিকেন দম বিরিয়ানি এবং কড়াই গোস্ত। এদের মধ্যে পেশোয়ারী মুর্গটা ব্যাপক ছিল, বিরিয়ানি ঠিকঠাক তবে কড়াই গোস্ত-এর মাটনটা ভালো লাগেনি, বেশীরভাগই ভুলভাল পিস এবং বেশ শক্ত। আমি মনে করি সঠিক মাটন কাটা মানে মাটনের পিস সঠিকভাবে করা কিন্তু একটা শিল্প আর সবাই তো বড় শিল্পী হতে পারেনা। এছাড়াও সুপ এবং স্যালাড ছিল, যদিও আমি সুপের খুব একটা ভক্ত নই, তবে বিভিন্নরকম স্যালাড বানাতে এবং খেতে আমার ভালোই লাগে। এদের পাস্তা স্যালাড আর চিকেন স্যালাডটা ভালো হলেও সি-ফুড স্যালাডটা একদমই ভালো লাগেনি।

মেনকোর্সটা ঠিক জুতসই না হওয়ায় আমরা তিনজনেই একটু দমে গেলাম। কিন্তু মনটা বারবার অভয় দিচ্ছিল এদের ডেসার্টের কিন্তু সুখ্যাতি আছে, তাই আশা করে রইলাম যে এরপরে আমরা আর হতাশ হবোনা। গুটি গুটি পায়ে আশা-আশংকার দোলাচলে ডেসার্ট সেকশনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু একি! এ আমি কোথায় এলাম!? আমার মনে হল আমি এল-ডোরাডোতে পৌঁছে গেছি, চারদিকে সোনার মতো বা তার চেয়েও লোভনীয় সব ডেসার্টের মেলা। প্রথমেই ছিল নাট্টি ব্রাউনি, তারপর বেকড আমন্ড চিসকেক, সেমোলিনা(Semolina) কেকও ছিল। এই সেমোলিনা কেকের উৎপত্তি কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়া অঞ্চলে। এছাড়া ছিল জেব্রা প্যাস্ট্রি, জামুন পানাকোট্টা বা পানাকোটা আর ম্যাঙ্গো অ্যাণ্ড সাগো পুডিং। এদের মধ্যে পানাকোটা ইতালিয়ান ডেসার্ট আর ম্যাঙ্গো অ্যাণ্ড সাগো পুডিং হংকং ও তাইওয়ানের খুবই জনপ্রিয় ডেসার্ট।

এইসব তো গেলো বিদেশী ডেসার্টের লিস্টি, দেশী ডেসার্ট যারা ছিল তারাও কিন্তু মারকাটারি। উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের অনেক পুরনো ও জনপ্রিয় ডেসার্ট মুঙ্গ ডাল কা হালওয়া, আমাদের সবার প্রিয় মিনি হট গুলাব জামুন আর কেশরী ফিরনি। এরা শাহি টুকরাও করে তবে সেদিন ছিলোনা। আমরা তিনজনেই ডেসার্ট খেয়ে আনন্দে আত্মহারা। যদিও আমি বেশী খেতে পারিনি সেটা আমার ডেসার্ট প্লেটের ছবি দেখলেই সকলে বুঝতে পারবে। এরপর শুধু বাকি রয়ে গেলো কুলফি। কুলফির কাউন্টারে গিয়ে শুনি ছ’রকম কুলফির মধ্যে তিনরকম আছে। তবে যার জন্য যাওয়া সেই বিখ্যাত পান কুলফি ছিল, খেয়ে বুঝলাম কেন সে বিখ্যাত। যেমন সুন্দর সাজিয়েছিল তেমনি তার স্বাদ, আহা, আহা লিখতে জিভে জল চলে এলো, টেনে নিলাম সুড়ুৎ করে আর নিয়েছিলাম ম্যাঙ্গো কুলফি,সেটাও মন্দ নয়। আমার বাবার ম্যাঙ্গো কুলফি বেশী ভালো লেগেছিল।

কুলফি খাওয়া শেষ করে আমরা তিনজন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম কয়েক সেকেন্ডের এদিক ওদিকে, বাবার ভাষায় ‘ইন্সট্যান্ট হজম’ করলাম। আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমি অল্পই খেয়েছি তাও কেন যে আমার ভুঁড়িটা বেশ এগিয়ে ছিল বুঝলাম না, নিশ্চয় কিছু একটা অজানা ষড়যন্ত্র আছে।

বিলপর্ব মিটিয়ে বার্বিকিউয়ের দেশ থেকে বাইরে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে দেখি মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে, তার মধ্যেও ভাগ্য দুম করে ক্লিক করল আর সস্তায় একটা ক্যাব পেয়ে গেলাম।। সত্যিই বার্বিকিউ নেশান-এর বাফেট কলকাতার অন্যতম সেরা বাফেট। বাফেটের সুখস্মৃতি নিয়ে এবং আবার আসার অঙ্গীকার করে বাড়ির পথে এগিয়ে চললাম।

চিকেন ফ্রায়েড রাইস, চিকেন সেজওয়ান আর সি-ফুড স্যালাড
স্যালাড কাউন্টার
পেশোয়ারী মুর্গ
চিকেন দম বিরিয়ানি, কড়াই গোস্ত, দই মাছ আর আকুরি
বাটার নান
বেকড আমন্ড চিসকেক
কেশরী ফিরনি
এটাই আমার ডেসার্ট প্লেট…..
হট মিনি গুলাব জামুন, জেব্রা প্যাস্ট্রি, সেমোলিনা কেক আর ফিরনি
মুঙ্গ ডাল কা হালওয়া
পান কুলফি
ম্যাঙ্গো কুলফি

বার্বিকিউয়ের দেশে: প্রথম পর্ব

আপনারা কেউ বলতে পারবেন ‘নেশান’ কথাটার সঠিক অর্থ কি? অনেকেই আমায় বলতে পারেন, ‘আরে ডিকশনারী দেখে নাও’,কিন্তু এ.টি. দেবের সেই ডিকশনারী আমরা এখন আর খুলেও দেখিনা, অগত্যা আমি গুগল ডিকশনারী থেকে যা পেলাম: ‘A large body of people united by common descent, history, culture or language, inhabiting a particular country or territory’. মানেটা পড়ে আর আর ইতিহাসের পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম, একটা দুটো নেশান নয় পুরো পৃথিবীটাই সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে বার্বিকিউয়ের সাথে জড়িত। আরে ছোটবেলায় ভূগোল (বরাবর গোল পেতাম) বইতে পড়তাম পৃথিবী নাকি একসময় জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ছিলো যা ক্রমে ঠাণ্ডা হতে হতে আজকের এই পৃথিবীর রূপ নিয়েছে। মানে পৃথিবী নিজেই একসময় বার্বিকিউ স্টেজ পেরিয়ে এসেছে। তবে ঝলসে খাওয়ার রীতিটা কিন্তু সেই প্রাচীন যুগ থেকে। মানুষ সৃষ্টি হলো, তারা আগুনের ব্যবহার শিখলো এসব প্রায় লক্ষ লক্ষ বছর আগের কথা। নিয়েনডারথাল মানুষরা তখনো আসেনি, হোমো ইরেক্টাস হোমোনিডদেরই তখন দাপাদাপি। এই হোমো ইরেক্টাসরাই প্রথম কাঁচা মাংসকে ঝলসে নিয়ে খেতে শুরু করেছিল। বার্বিকিউয়ের কাঁচা ইতিহাসের শুরু এখান থেকেই, ঝলসানো মাংসে এক কামড় দিয়েই সেই হোমো ইরেক্টাসরা বুঝেছিল এই স্বাদের ভাগ হবে না।

ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে জানা যায়, যীশুখ্রীষ্টের জন্মের ১৩০০-১৫০০ বছর আগে প্যালেস্টাইনের মানুষেরা বার্বিকিউয়ের মতো করে ভগবানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জীবজন্তুর আহুতি দিতো এবং সেটা পরে খাওয়া হতো। তবে বার্বিকিউ কথাটির উৎপত্তি ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে। অনেকের মতে, ক্যারিবিয়ান ইন্ডিয়ান উপজাতি টাইনো (Taino) প্রথম বার্বাকোয়া শব্দের প্রচলন করে যার মানে কাঠের জালির উপর খাবারটিকে গ্ৰিলড করে নেওয়া (Grilling on a raised wooden grate)। আবার অনেকের মতে, আরওয়াক (Arawak) বা ফ্লোরিডার টিমুকুয়া (Timucua) উপজাতি এই শব্দের প্রচলন করে। কিন্তু বার্বাকোয়া বা বার্বিকিউ শব্দটিকে বিশ্বের দরবারে জনপ্রিয় করেছিলেন গঞ্জালো ফার্নান্দেজ ডি অভিয়েডো ভালদেস নামে একজন স্প্যানিশ আবিষ্কারক। আমরা সকলেই জানি ১৪০০-১৬০০ সালের সেই সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বেশকিছু উৎসাহী মানুষ একটা জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন নতুন দেশ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে। এইভাবেই ক্যারিবিয়ান শব্দ বার্বাকোয়া জায়গা করে নিলো স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ইংলিশ অভিধানে। প্রাচীন চীন, ভারত ও জাপানেও বার্বিকিউ-এর প্রচলন ছিলো তবে একটু অন্যভাবে, ভারতে তন্দুর কিংবা জাপানে কামাডো বার্বিকিউয়ের এক পরিবর্তিত রূপ। তবে আমেরিকানরা বার্বিকিউকে এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে, পুরো মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন জায়গায় বার্বিকিউ বানানোর পদ্ধতি বিভিন্নরকম,সে আলোচনা অন্য একদিন করা যাবে।

আরে দেখুন! নেশান-এর সঠিক অর্থ জানতে বেরিয়ে কোথায় চলে এলাম। জেনেটিক্সের ছাত্র হয়েও ক্যানো যে এতো ইতিহাসের দিকে চলে যাই কে জানে। এই নেশান আর বার্বিকিউ নিয়ে এতো কচকচি কারণ সপ্তাহ দুয়েক আগে সপরিবারে গেছিলাম বার্বিকিউ নেশানের বাফেট খেতে। এই বাফেটের সুখ্যাতি বহুদিন থেকেই শুনছি। লোকজন খেয়ে বেশ ছবি পোস্ট করে, আমি গরীব মানুষ, সেইসব ছবিতে লোভ দিয়ে শুধু লাইক করে যেতাম কিন্তু বিশ্বাস করুন শত কষ্টেও স্যাড রিঅ্যাক্ট দিইনি। একদিন এই গরীবের কপালেও শিকে ছিঁড়ল, বোন চাকরি পেতেই ওর কাছে আবদার করলাম যেন প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই আমাকে আর বাবাকে বার্বিকিউ নেশানে খাওয়ায়। বোনটা আমার বড় ভালো, এককথায় রাজি। সেইমতো যাওয়ার দিন তিনেক আগে থেকে বুকিং করে রাখলাম এবং এতে বেশ সুবিধাই হয়।

নির্দিষ্ট দিনে আমরা তিনজনেই হাজির বার্বিকিউ নেশান, ডায়মন্ড প্লাজাতে। জমিয়ে বস্তেই চলে এল কমপ্লিমেন্টারি ড্রিংক আম পান্না, স্বাদে আর পরিমাণে তার জুড়ি মেলা ভার। ইতিমধ্যেই টেবিলে বার্বিকিউ -এর সেট আপ করা হয়ে গেলো। আমি আগে থেকেই প্ল্যান করেছিলাম যে স্টার্টার খাবো তবে প্রচুর পরিমাণে একদমই নয় আর আমি প্রচণ্ডভাবে নন-ভেজ তাই ভেজ স্টার্টারে নৈব নৈব চ। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। শুরুতেই এলো কাজুন স্পাইস পটাটো। ওয়েটার একগাল হেসে বলল, “স্যার, এটা দি?” আমি হাত তুলে বলে উঠলাম,” নো আলু, নো ভেজ”। কিন্তু বাঙালী আলু নিয়ে ভীষণভাবে অবসেসড, আমার বাবারও তীব্র বাঙালী সত্ত্বা জেগে উঠলো এবং বলে উঠল, “আপনি দিন, আমি খাবো”। ওয়েটার আমার দিকে মুচকি হেসে দিয়ে চলে গেলো। আমি বাবার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে তাকালেও সে আমলই দিলো না, উল্টে আমায় একটু কাজুন স্পাইস পটাটো দিল, খেয়ে দেখলাম মন্দ নয়। এরপর দিয়ে গেলো ক্রিসপি মশালা কর্ন, এটা আমার বেশ ভালো লেগেছে খেতে।

ডিফেন্সের বোকা বোকা ভুলে এক গোল খেয়ে আমি তখন মরীয়া। এরই মাঝে সেই ওয়েটার আবার হাজির পনীর টিক্কা লাজিজ নিয়ে। এবার আমি রে রে করে উঠলাম, “চিকেন, প্রণ, ফিস এইসবগুলো কি কিছুই নেই?” এইরকম কাউন্টার অ্যাটাকে গোল খেয়ে অপ্রস্তত ওয়েটার বলল, “স্যার দু-মিনিটের মধ্যে আনছি”। ভেবেই অবাক হলাম, সাহস কী! আমার মত নন-ভেজ মানুষের পাতে কিনা পনীর!! সেই ছোটবেলা থেকে পনীরকে আমি দুচোখে দেখতে পারিনা, যদিও আমার বাড়িতে সবাই কিন্তু পনীরকে বেশ আপন করে নিয়েছে বরাবর।

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই প্রবেশ করলেন চিকেন টিক্কা কাবাব আর গ্রিলড বাসা। ওটা খেতে খেতেই হাজির রোস্টেড চিকেন উইংস আর মাটন শিক কাবাব। প্রচুর খাবোনা ভেবেও কতগুলো কাবাব যে উদরস্থ করেছি তা মনে আসছে না। লাইভ বার্বিকিউ দেখে বাবা আর বোনও বেশ উত্তেজিত ও আনন্দিত। কাবাব পর্ব সারার মুখে এমন সময় প্রণ কাবাবের কথা মনে পড়ল, বলার সাথে সাথে কোস্টাল বার্বিকিউ প্রণ হাজির। প্রতিটা কাবাব অত্যন্ত সুস্বাদু, কাবাবের অথেনটিক ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় উপস্থিত। সবাই জানে তায় একবার বলা, বার্বিকিউ নেশানে স্টার্টারটা টেবিলে সার্ভ করে দেয় কিন্তু মেন কোর্স টু এন্ড কোর্স অব্দি নিজেকে নিয়ে নিতে হবে নিজের পছন্দমতো এবং পুরোটাই আনলিমিটেড। এই আনলিমিটেড কথাটা হোটেলের একজন স্টাফের মুখে শুনে চোখে আনন্দাশ্রু এসে গেছিলো, কোনোরকমে সামলে নিয়ে কাবাবের প্রতি আবার মনোযোগ দিয়েছিলাম।

ক্রমশ…..

আম পান্না
চিকেন টিক্কা কাবাব
কোস্টাল বার্বিকিউ প্রণ
গ্রিলড বাসা আর চিকেন টিক্কা কাবাব

গুপী বাঘার পঞ্চাশ বছর

দেখতে দেখতে পঞ্চাশটা বছর পেরিয়ে গেলো উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রচিত গুপী আর বাঘার যারা প্রাণ পেয়েছিলো আমাদের সবার প্রিয় সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে। বাঙালী এমনিতেই স্মৃতিমেদুরতায় ভোগা জাতি, পঞ্চাশ বছর পরে এসে তাই গুপী গাইন বাঘা বাইন নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণা আর তারই মধ্যে দিয়ে জানা অজানা পঞ্চাশটি তথ্য যা হয়তো আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না।

১. ১৯৬৯ সালের ৮ই মে ১৩২ মিনিটের এই ছবি মুক্তি পায় কলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে।

২. তাঁর অনেকগুলি ছবির মত এই ছবির গানের কথা এবং সুর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।

৩. তবে সিনেমারূপে বেরোনোর পূর্বে গুপী বাঘার প্রথম আত্মপ্রকাশ ১৯১৫ সালের ‘সন্দেশ’ পত্রিকায়।

৪. কলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে এই সিনেমা টানা ৫১ সপ্তাহ চলেছিল।

৫. কলকাতার গ্লোব সিনেমাহলে এই ছবি ইংলিশ সাবটাইটেলসহ বেশ কয়েকমাস চলেছিল।

৬. ১৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চ থেকে এই ছবি জিতে নেয় সেরা ফিচার ফিল্ম ও সেরা পরিচালনার পুরস্কার।

৭. এই ছবির বাজেট ছিলো সেইসময় ছয় লাখ টাকা। প্রথমে কলম্বিয়া পিকচার্সের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে এই ছবি ও অন্য আর একটি ছবি হলিউডে করার পরিকল্পনা করেছিলেন সত্যজিৎবাবু কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই প্রজেক্ট শুরু করা যায়নি। তবে এতো বড় বাজেটের ছবির জন্য প্রযোজক পেতে বেশ বেগ পেতে হয় তাঁকে অবশেষে পূর্ণিমা পিকচার্সের নেপাল দত্ত ও অসীম দত্ত ছবিটি প্রযোজনা করেন।

৮. এমনকি রাজ কাপুর চেয়েছিলেন এই ছবিতে গুপীর চরিত্রে অভিনয় ও ছবিটি প্রযোজনা করতে, সাথে অবশ্য ছিলো বেশ কিছু শর্ত যার মধ্যে অন্যতম ছিলো হিন্দীতে এই ছবির নির্মাণ এবং বম্বেতে পুরো শুটিং।

৯. শেষপর্যন্ত অবশ্য অসীম দত্ত এগিয়ে আসেন এবং মানিকবাবুকে বলেন হিন্দী নয় বাংলাতেই তৈরী হোক গুপী গাইন বাঘা বাইন।

১০. এই ছবির শুটিং হয়েছিল বাংলার সিউড়ি, বোলপুর ও হেতমপুরে এবং রাজস্থানের বুঁদি ও জয়সলমীরে।

১১. আমরা সকলেই জানি এই ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জঙ্গলের মধ্যে গুপী বাঘার সামনে ভূতেদের নাচ। সাড়ে ছয় মিনিটের এই নাচটি পরিচালনা করেছিলেন শম্ভুনাথ ভট্টাচার্য ও সত্যজিৎ রায়।

১২. এই নাচের দৃশ্যের মাধ্যমে ভূতসমাজের মধ্যে দিয়ে সমাজের বিভিন্নস্তরকে দেখিয়েছিলেন তিনি, যেমন সৈন্য, চাষী, মজুর,সাহেব,বণিক, ডাকাত, নর্তক, ধর্মযাজক,পণ্ডিত এমনকি বাঙালীর ‘বাবু’ কালচারকেও তিনি এই নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন।

১৩. এই নাচের দৃশ্যটি চারটে পার্টে করা হয়েছিল আলাদাভাবে এবং পরে অপটিক্যাল ক্যামেরার মাধ্যমে চিত্রগ্রাহক সৌমেন্দু রায় এই পার্টগুলিকে জোড়া লাগিয়েছিলেন।

১৪. কিশোর সন্দীপ রায়ের অভিযোগ ছিলো তাঁর বাবা শুধুমাত্র বড়দের জন্য ছবি বানান ততোদিনে অপু ট্রিলজি আর চারুলতাসহ ১৩টি ছবি বানিয়ে সত্যজিৎ সফলতার শীর্ষে। সত্যজিৎ ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন ছোটদের জন্য ছবি বানোনোর এবং তাঁর প্রথম পছন্দই ছিলো গুপী গাইন বাঘা বাইন।

১৫. সত্যজিৎ রায়ের মতে এটি আদ্যোপান্ত ছোটোদের জন্য তৈরি একটি সিনেমা আর সন্দীপ রায়ের মতে, ‘ছোটোদের জন্য তৈরি সিনেমা যেটা বড়রাও দেখতে পারেন’।

১৬. মানিকবাবুর স্বপ্ন ছিলো এই ছবিটি রঙিন বানোনোর কিন্তু বাজেটের সমস্যার জন্য শুধুমাত্র শেষ সিনটি কালার করা সম্ভব হয়।

১৭. গুপীর চরিত্রে এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তপেন চ্যাটার্জি, কিন্তু তপেনবাবুর আগে এই চরিত্রের জন্য তিনজনকে পছন্দ করেন মানিকবাবু। তাঁর প্রথম পছন্দ ছিলো অরুণ মুখার্জী, তারপর কিশোর কুমার এবং জীবনলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষপর্যন্ত অবশ্য সুযোগ মেলে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ অ্যাডভারটাইসিং বিভাগের কর্মী তপেনবাবুর।

১৮. সত্যজিৎ রায়ের গুপী গাইন বাঘা বাইন-এর প্রভাব দেখা যায় বিখ্যাত সাহিত্যিক সলমন রুশদির ‘হারুন অ্যাণ্ড দ্য সী অফ স্টোরিস’ উপন্যাসে কিংবা হালফিলের ‘জগ্গা জাসুস’ ছবিতে।

১৯. আমরা সবাই জানি এই ছবিতে একটা দৃশ্য আছে যেখানে গুপী বাঘা গান গেয়ে হাল্লার সৈন্যদলকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত করে এবং তারপর শুরু হয়েছিল রাজভোগের বৃষ্টি। যুদ্ধ করা ভুলে সেই রাজভোগের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হাল্লার সেনারা। শোনা যায় এরপর কলকাতার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে রাজভোগের বিক্রি একলাফে অনেকটাই বেড়ে যায় এবং মিষ্টির দোকানের মালিকদের ট্যাগলাইন ছিলো সেসময়, ‘রাজভোগ খান, সবরকমের যুদ্ধ থামান’।

২০. আজকাল শহরে সার্কাসের চল অনেকটাই কমে গেছে, আমিও ছোটবেলায় অনেক সার্কাস দেখেছি। গুপী বাঘার একটি সিনে যেখানে গুপী বাঘার দুজনেরই জঙ্গলের মধ্যে দেখা হয় বাঘের সাথে। এই বাঘ আনা হয়েছিলো উত্তর কলকাতার মার্কাস স্কোয়ারের একটা সার্কাস থেকে। সত্যজিৎ রায়ের ‘একেই বলে শুটিং’ বইতে আমরা এই বাঘ এবং সেই বাঘের কীর্তি সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ পাই।

২১. সত্যজিৎ রায়ের মতো নিখুঁত মানুষ ভারতীয় সিনেমা খুব কমই পেয়েছে, শুধু পরিচালনা বা সঙ্গীত নয়, প্রতিটা চরিত্রের ড্রেস মেকআপ সমস্তটা উনি নিখুঁতভাবে নজর করতেন। গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবিতে হাল্লারাজার যাদুকর ‘বরফি’-র চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং ওনার মেকআপ আর ড্রেস সবচেয়ে বেশী ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিলো।

২২. প্রতিটা চরিত্রের ড্রেস উনি নিজে ডিসাইন করেছিলেন এমনকি বাঘের গলায় যে বকলস ছিলো সেটাও বাঘের চামড়ার মতো দেখতে করা হয়েছিল যাতে ক্যামেরায় লোহার তার বোঝা না যায়।

২৩. সত্যজিৎ রায় যে চরিত্রটা ভাবতেন সেটা উনি এঁকে ফেলতেন আর বলতেন চরিত্ররা বিহেভ করবে আর যদি কিছু অভিনয়ের দরকার হয় সেটা আমি শিখিয়ে নেবো। গুপী গাইন বাঘা বাইনের প্রতিটা চরিত্রকে উনি স্ক্রিপ্টের সাথে সেই চরিত্রের একটা হাতে আঁকা ছবি দিতেন সেটা বাঘার চরিত্রে রবি ঘোষ হোক বা হাল্লার গুপ্তচরের ভূমিকায় থাকা চিন্ময় রায়।

২৪. এই ছবিতে বাঘের দৃশ্যটা দুবার শুটিং করতে হয়েছিল প্রথমবার ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে একটা বাঁশবাগানে কিন্তু ক্যামেরার সমস্যার জন্য দ্বিতীয়বার শুটিং করা হয় গড়িয়ার বোড়ালের এক বাঁশবাগানে। তখন বোড়াল অঞ্চল আজকের মতো এতো জমজমাট ছিলো না।

২৫. বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এই ছবির প্রদশর্নের সময় প্রধান চরিত্রদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রবি ঘোষ। রবি ঘোষ ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের খুবই কাছের একজন উইটিলিটি অভিনেতা, যাকে উনি যে চরিত্রই দিতেন সদা অমায়িক রবি ঘোষ তা হাসতে হাসতে করে দিতেন।

২৬. পেশায় উকিল সন্তোষ দত্ত ছিলেন একদম ঘড়ি ধরে চলা মানুষ। প্রথমে আদালতে যেতেন তারপর যেতেন শুটিংয়ে, শুটিং সেরে বাড়ি ফিরে অনেক রাত পর্যন্ত তিনি পরের দিনের কেসের পড়াশোনা করতেন। তিনিই একমাত্র অভিনেতা যিনি গুপী বাঘা সিরিজের দুটো ছবিতেই দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

২৭. গানের প্রতিযোগিতায় নাম দিতে গুপী বাঘা যাবে শুণ্ডী, কিন্তু কিছুতেই মনে আসছিল নামটা, হাতে তালি মেরে তাঁরা বললো ঝুণ্ডী আর পৌঁছে গেলো বরফের দেশে। এইটুকু শুটিংয়ের জন্য মানিকবাবু তাঁর দলবল নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সিমলা থেকে আট মাইল দূরে হাজার ফুট উঁচুতে কুফরি নামক এক গ্রামে।

২৮. হাতে তালি দেবার পর গুপী বাঘার শূন্যে উঠে যাবার দৃশ্য সত্যজিৎ রায় তুলেছিলেন ক্যামেরার ফিল্মকে উল্টো দিকে চালিয়ে এর ফলে উল্টে তোলা ছবি পর্দায় সোজাভাবে চালালে পর্দায় আবার সেটা উল্টে যাবে আর মনে হবে গুপী বাঘা নীচ থেকে হুশ করে উপরে উঠছে।

২৯. ঝুণ্ডী, হুণ্ডী, শুণ্ডীর সাড়ে তিন মিনিটের শটের শুটিংয়ের জন্যই লেগেছিল প্রায় তিনমাস।

৩০. কুফরিতে শুটিং চলাকালীন ঘটেছিল এক মজার ঘটনা, বরফের মাঝে হারিয়ে গেছিলো গুপী বাঘার সেই ভূতের রাজার দেওয়া জুতোজোড়া। আমরা কেউই জানিনা কে ছিলো সেই ভাগ্যবান যে কোনোদিন খুঁজে পেয়েছিলো সেই জুতোজোড়া।

৩১. হাল্লারাজার সেনার জন্য লেগেছিলো এক হাজার উট ও তাদের এক হাজার সওয়ার।

৩২. উটের মালিকদেরকেই বানানো হয়েছিলো সওয়ারী আর উট ও এই সওয়ারীদের জন্য সাজপোষাক এসেছিল মুম্বাই থেকে।

৩৩. এই হাজার উটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তৎকালীন জয়সলমীরের রাজা।

৩৪. এই ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের সহকারী হিসাবে কাজ করেছিলেন তিনু আনন্দ।

৩৫. তিনু আনন্দের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, পুরো ছবির সারসংক্ষেপ নিজে হাতে টাইপ করে তিনু আনন্দকে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। ওনার নিজে হাতে টাইপ করা সাত পাতার সেই সারসংক্ষেপ আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তিনু আনন্দ।

৩৬. ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা’ গানটি ছিলো সাড়ে চার মিনিটের আর এই গানের দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল দুদিন ধরে।

৩৭. হাল্লার সেনারা বেশীরভাগই ছিলো আধপেটা খেয়ে থাকা তাই মিষ্টির হাঁড়ি আকাশ থেকে পড়তেই তারা ঝাঁপিয়ে পরে এবং হাভাতের মতো খেতে থাকে, এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী চোখে পড়েছিলেন একজনকে, তিনি ছিলেন কামু মুখার্জী যিনি একাই অর্ধেক মিষ্টি সাবাড় করেছিলেন।

৩৮. মানিকবাবুর লেখা থেকে জানা যায়, জয়সলমীরে আর কিছু পাওয়া না গেলেও ক্ষীরের মিষ্টি প্রচুর পাওয়া যেতো আর কয়েকশো হাঁড়ি মিষ্টি এই সিনেমার শুটিংয়ের জন্য আনা হয়েছিল।

৩৯. প্রথমে কিশোর কুমারের এই ছবির গানগুলি গাওয়ার কথা থাকলেও পরে একটি ছাড়া বাকি সব গান গেয়েছিলেন অনুপ ঘোষাল। অনুপ ঘোষালের গায়কী এক নতুন মাত্রা যোগ করে এই ছবিতে।

৪০. শুধুমাত্র মিষ্টি খাওয়া নয় এই ছবির সেই বিখ্যাতগান ‘হাল্লা চলেছে যুদ্ধে’ গেয়েছিলেন জহর রায় ও কামু মুখার্জী।

৪১. বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়েছিলো এই ছবি যেমন অকল্যাণ্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের, মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা ছবির পুরষ্কার।

৪২. গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবিতে চিত্রগ্রাহক ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের চিরকালীন সঙ্গী পদ্মশ্রী নিমাই ঘোষ।

৪৩. কি থেকে যে কি হয়ে যায় তা আমরা কেউ জানি না আবার অনেক সময় যা হয় তা ভালোর জন্যই হয়। গুপী গাইন বাঘা বাইন-এর শুটিং চলাকালীন কিছুটা শখের বশেই দু-রিল স্টিল ফটো তুলেছিলেন নিমাইবাবু। এইসব ছবি ডেভেলপ করা হয়েছিল বালিগঞ্জ-এর রেনেসাঁ স্টুডিওতে যেখানে আনাগোনা ছিলো সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহার মতো বিখ্যাত মানুষদের।

৪৪. গুপী গাইন বাঘা বাইনে তোলা নিমাইবাবুর প্রথম স্টিল ফটো ছিলো সেই দৃশ্যটা যেখানে গাছের পাতা থেকে টপটপ করে জল এসে বাঘার ঢোলকের উপর পড়ছিলো।

৪৫. সেইছবি দেখে মুগ্ধ সত্যজিৎ রায় তারপর আর নিমাই ঘোষকে হাতছাড়া করেননি, গুপী গাইন বাঘা বাইন থেকে শুরু করে আগন্তুক পর্যন্ত এক লাখেরও বেশী ছবি তিনি তুলেছিলেন।

৪৬. আমরা সকলেই এই তথ্য জানি যে ভূতের রাজা যে লাইটিং ব্যাকগ্রাউন্ডের মধ্যে দিয়ে পর্দায় আবির্ভূত হন সেটি বানানো হয়েছিল বাঁশের উপর বাল্ব লাগিয়ে। আর ভূতের রাজার কণ্ঠস্বরটি ছিলো স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের।

৪৭. এই ছবিতে আলোর ব্যবহারকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছিলেন সত্যজিৎ রায়। যেমন শুণ্ডীর ভালো রাজার জন্য মোলায়েম ও আরামদায়ক সাদা আলোর ব্যবহার ছিলো, উল্টোদিকে হাল্লার দুষ্ট রাজার জন্য ছিলো কম আলো ও ছায়াঘেরা এক পরিবেশ।

৪৮. প্রযোজকদের চাপে পড়ে সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে দুজন মহিলা চরিত্র রাখতে রাজি হন যারা ছিলেন শুণ্ডীর রাজকন্যা। কিন্তু পর্দায় তাদের উপস্থিতি ছিলো বড়জোর মিনিট তিনেক।

৪৯. গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবিতে সত্যজিৎ
রায় মূলত কারনেটিক ঘরানার সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন এবং এর সাথে মিশিয়েছিলেন বিভিন্নরকমের পল্লীগীতি।

৫০. ২০০৩ সালে অ্যাকাডেমি অফ ফিল্ম আর্কাইভ এই ছবিটিকে সংরক্ষণ করে।

তথ্যের কোনো শেষ হয়না আর মানিকবাবুর সিনেমা বানানোর পুরো অধ্যায়টা জুড়ে থাকে নানারকম ঘটনা যা তাঁর ছবির থেকে কম ইন্টারেস্টিং নয়। সেই পথের পাঁচালী থেকে শুরু করে আগুন্তুক পর্যন্ত তাঁর যাত্রাপথের পুরোটাই বিভিন্ন মণিমানিক্যে ভরা। শুণ্ডী আর হাল্লা দিয়েই উনি দেখিয়েছিলেন ভালো আর মন্দের দ্বন্দ্ব, যদিও শুণ্ডীর মতো রাজ্য আজকের দিনে অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। শেষ করবো গুপী গাইন বাঘা বাইনেরই আমার খুবই পছন্দের একটা দৃশ্যের কথা বলে, হাল্লার মন্ত্রী থালা ভর্তি সুখাদ্য সাজিয়ে খেতে বসেছেন এমন সময় হাজির ক্ষুধার্ত গুপ্তচর, লুব্ধলোলুপ দৃষ্টিতে মন্ত্রীর থালার দিকে তাকিয়ে। বিরক্ত মন্ত্রী প্রশ্ন করলেন শুণ্ডীর সামরিক শক্তির বিষয়ে, গুপ্তচর জানালো ওদের না আছে গোলাবারুদ না আছে সৈন্যবাহিনী, মন্ত্রী শুধালেন, ‘তাহলে আছে কি?’ গুপ্তচর বলল, “ক্ষেতে ফসল আছে, গাছে ফুল আছে, ফল আছে, পাখি আছে, দেশে শান্তি আছে”।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১.’একেই বলে শুটিং’-সত্যজিৎ রায়
২. ‘নিমাই ঘোষের চোখে সত্যজিৎ রায়’- পৌলমী নাগ

#কলকাতার_এক_কলমচি

(০৮/০৫/২০১৯)

ব্রেন টনিকের খোঁজে

ফেব্রুয়ারির শেষ আর মার্চের প্রথমের বৃষ্টি দেখে আমার মতো যারা ভেবেছিলো এই বছর গরম হয়তো কম পড়বে বা হয়তো এইরকম ওয়েদারই বেশীরভাগ সময় থাকবে তাঁদের মিথ্যে প্রমাণ করে স্বমহিমায় গ্রীষ্মকাল হাজির। কবিগুরু আবার বলেছিলেন, “এসো হে বৈশাখ এসো,এসো”, কবির সাহস ছিলো অসীম আমি বৈশাখ তো দূর চৈত্র এলেই শঙ্কিত হয়ে থাকি। এই গরম এখন চলবে অক্টোবর পর্যন্ত কিন্তু এরই মধ্যে নিজেদের বাঁচিয়ে তো রাখতেই হবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিজেদের মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। সবসময় যে ঠাণ্ডা জিনিস খেলেই মাথা ঠাণ্ডা থাকে এইতথ্য পুরো ঠিক নয়, মাঝে মাঝে উপাদেয় বা অতি উপাদেয় কিছু খাদ্যবস্তু ব্রেন টনিকের কাজ করে আর গরমের শুরুতে এইরকম ব্রেন টনিক খেলে মাথা, পেট আর মন সবাই শান্ত আর খুশী থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কি সেই খাদ্যবস্তু যা ব্রেন টনিকের কাজ করে? সেটার উত্তর পেলাম আমাদের সবারই অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রিয় এক দাদার থেকে, সেই দাদা আর কেউ নয় ফেলুদা ওরফে প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ‘নেপোলিয়নের চিঠি’ উপন্যাসে রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেলের আওয়াধী খানা খেতে খেতেই বিভিন্ন সূত্র খুঁজে পেয়েছিল থ্রি-মাস্কেটিয়ার্স আর ফেলুদার মুখ থেকে বেরিয়েছিলো সেই বাণী “রয়্যাল-এর খাবার যে ব্রেন টনিকের কাজ করে, সেটা জানা ছিলো না!!!” যা আজও ১০০% নির্ভুল। বিশ্বজ্যোতি মানে আমাদের বিশুভাই যখন সেই রয়্যালে খাওয়ানোর প্রস্তাব দিলো আমরা আর বিন্দুমাত্র ভাবিনি।

অবশেষে পয়লা বৈশাখের দুদিন আগে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আমাদের সাতজনের গ্রুপ জমায়েত হলো রয়্যালের সামনে, অবশ্য আমরা ছ’জন তখনো এসে হাজির সুপ্রিয় বরাবরের মতো লেট। ভাবলে অবাক লাগে ভারতের একমাত্র পি.এইচ.ডি স্কলার এই সুপ্রিয় যে রয়্যাল ইন্ডিয়ানের বিরিয়ানিকে উপেক্ষা করেও নিজের গবেষণাকে বেশী প্রাধান্য দেয়। আমি যদিও ভগবান মানিনা তাও বিরিয়ানির দেবতা বলে যদি কেউ থাকে তাঁকে বলছিলাম,”সুপ্রিয়কে মাফ করো, ও জানেনা ও কি পাপ করছে।” হোটেলের সামনে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম আর আমি মনে মনে সুপ্রিয়র মুণ্ডুপাত করতে থাকলাম, এদিকে চোখের সামনে বড় কড়াইয়ে (লগন) মাটন চাঁপ তৈরী হচ্ছে অথচ আমি শুধু দেখছি আর ঘ্রাণ নিচ্ছি। ঘ্রাণ নিতে নিতেই একটু ইতিহাস রোমন্থন করে নিলাম যদিও রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেলের ইতিহাস সবাই কমবেশী জানে। আজ থেকে ১১৫ বছর আগের কথা তখন ১৯০৫ সাল, লর্ড কার্জনের করা বঙ্গভঙ্গে উত্তাল সারা বাংলা, সেইসময় উত্তরপ্রদেশের নাদানমহল থেকে কলকাতায় হাজির হলেন আহমেদ হুসেন। সুঠাম চেহারার আহমেদ হুসেন ছিলেন পেশাদার পালোয়ান, সেই পেশাতেই আরো নামযশের জন্য তাঁর কলকাতায় আগমন কিন্তু হালে তিনি ঠিক পানি পাচ্ছিলেন না। এদিকে কলকাতায় যে একবার আসে সেই এই শহরের প্রেমে পড়ে যায়, সে আন্দ্রে রাসেল হোক বা আহমেদ হুসেন। আহমেদও এই শহরেই নিজের টিকে থাকার লড়াই শুরু করলেন। আহমেদের বাবা ছিলেন লখনৌয়ের নবাব পরিবারের একজন নামকরা আওয়াধী খানার কারিগর, যদিও ততোদিনে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্ মেটিয়াব্রুজকে ‘মিনি লখনৌ’ বানিয়ে ফেলেছেন। বাবার কাছে ছোটো থেকেই চাঁপ,কোর্মা, কাবাব, বিরিয়ানি তৈরীতে পারদর্শী হয়ে উঠেছিল আহমেদ হুসেন আর একরাশ স্বপ্ন ও সাহস সম্বল করে হাজির হয়েছিল তৎকালীন কলকাতায় যেখানে ওলা-উবেরের দাপট ছিলো না, ছিলো ঘোড়ায় টানা ট্রাম।

আহমেদের হাত ধরে এক টুকরো আওয়াধী ঘরানার নবাবী খানা জন্ম নিলো কলকাতার চিৎপুরে, সেখানেই ১৪৭ রবীন্দ্র সরণীতে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের পরিবারের থেকে একতলা ভাড়া নিয়ে আহমেদ খুললেন ‘রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেল’। মাত্র তিনটে পদ নিয়ে রয়্যালের যাত্রা শুরু হয়েছিল এদের মধ্যে ছিলো বিখ্যাত মাটন চাঁপ, মাটন কালিয়া আর খুশকা বা মশলাদার হলুদ পোলাও। দীর্ঘদেহী আহমেদকে ভালোবেসে প্রতিবেশীরা ডাকতেন ‘পালোয়ান চাঁপওয়ালা’ বলে, মাটির বড় উনুনের উপর থালার মতো লগনের মধ্যে মাটন চাঁপ, টিকিয়া রান্না করতেন আহমেদ যা ছিলো কলকাতার মানুষের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। লখনৌ ঘরানার সুস্বাদু মাটন চাঁপ যা রকমারি মশলা ও দেশী ঘি সহযোগে পাঁঠার পিঠের হাড়শুদ্ধু খণ্ড খণ্ড মাংস দিয়ে রান্না করা হতো কাঠকয়লার মৃদু আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে। এই সুবাসে আর সুস্বাদে অল্পদিনের মধ্যেই আহমেদের জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগলো। রয়্যালের সামনে শুরু হলো জমিদারবাবুদের জুড়িগাড়ির লাইন, শোনা যায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সকলে এমনকি রবীন্দ্রনাথ নিজে রয়্যালের খাবারের ভক্ত ছিলেন এবং নিজে না এলেও লোক মারফত তাঁর জন্য খাবার যেতো। পঞ্চাশের দশকে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান রয়্যালে আসেন এবং সেই থেকে তিনিও হয়ে ওঠেন রয়্যালপ্রেমী।

মোবাইলের প্যাঁকপ্যাঁকানিতে আবার ২০১৯ এর রয়্যালের সামনে ফিরে এলাম। সুপ্রিয় বলল মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে, সেই শুনে সকলে বলল, এই গন্ধ আর নেওয়া যাচ্ছে না, ওদিকে অলফ্যাক্টরি আর ভেগাস নার্ভ দুজনে যৌথ সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাচ্ছে ভেতরে। সৈয়দ আমীর আলি অ্যাভিনিউ-এর রয়্যালের ভিতরটা ছিমছাম কিন্তু বেশ সুন্দর, বসার সাথে সাথেই মেনুকার্ড হাজির আর আমরাও অর্ডার দেওয়াতে মনোযোগ করলাম। যেকেনো দলে একজন সভাপতি থাকে আর আমাদের দলের সভাপতি কমলিকা, সে আবার ‘পেটুক অ্যাসোসিয়েশন’-এর একজন অ্যাডমিন। আমরা ফেবুতে ‘পেটুক অ্যাসোসিয়েশন’ বলে একটা গ্রুপ চালাই, গ্রুপটা আপাতত ছোটো সাইজের কিন্তু বেশ অ্যাকটিভ আর আমাদের এই রয়্যালের খাওয়াদাওয়াটা আমাদের গ্রুপের প্রথম অফিসিয়াল মিট হিসাবে ধরা যেতেই পারে। কমলিকাই পছন্দ করলো শুরুতে চিকেন হরিয়ালী কাবাব আর চিকেন কস্তুরী কাবাব, ইতিমধ্যে সুপ্রিয়ও হাজির। রয়্যালের চিকেন আইটেমগুলোর শুরু ১৯৬০সালে যখন দেশজুড়ে সবুজ বিপ্লবের ঝড়। চিকেন হরিয়ালী কাবাব আর কস্তুরী কাবাব দুটোই অসাধারণ ছিলো, যেরকম দেখতে সেইরকমই খেতে, প্লেটে আসা মাত্রই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম। স্টার্টার খেতে খেতেই আমরা পরের ধাপের দিকে অগ্রসর হলাম, অর্ডার হলো রয়্যাল স্পেশাল মাটন কোফতি বিরিয়ানি আর আমার ইচ্ছা ছিলো সেই বিখ্যাত মাটন চাঁপ কিন্তু রয়্যালের লোকজনরাই মুর্গ মশল্লম ট্রাই করতে বললো, অগত্যা সেটাই অর্ডার দেওয়া হলো। ওদিকে স্টার্টার খেয়ে আমাদের খিদে আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রয়্যাল স্পেশাল মাটন কোফতি বিরিয়ানি আর মুর্গ মশল্লম এসে হাজির হলো, খেতে শুরু করার আগে প্রাণভরে প্লেটভর্তি বিরিয়ানিকে দেখার পালা। রয়্যালের বিরিয়ানির স্পেশালিটি হলো কলকাতার বাকি বিরিয়ানির মতো এরা আলু আর ডিম দ্যায় না। এর পিছনেও একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে, এক চামচ বিরিয়ানি মুখে পুরে সেটা সংক্ষেপে ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

আহমেদ হুসেনের বাবা ছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের রাখবদার। কলকাতায় এসেও নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ নিজের নবাবী বজায় রাখলেন মাত্র একলাখ (হ্যাঁ মাত্র, নবাবের চালচলনের কাছে সে যুগেও এই টাকা সামান্যই ছিলো) টাকা মাসোহারায়। নবাবের দুধরনের রাঁধুনী ছিলো খানসামা ও রাখবদার, খানসামারা সকলের জন্য রান্না করলেও রাখবদাররা নবাব ও তাঁর পরিবারবর্গের জন্য রান্না করতো। একটাসময় মাংসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে খানসামারা বিরিয়ানিতে আলু ও ডিমের ব্যবহার শুরু করলো কিন্তু রাখবদারদের মতে এটা ছিলো পাপ, সারা কলকাতা জুড়ে এরপর খানসামাদের ডিম আলুসহ বিরিয়ানি ছড়িয়ে পড়লেও রাখবদাররা নিজেদের বিরিয়ানির স্বকীয়তা আজও বজায় রেখেছে। এখানকার বিরিয়ানি খেয়ে আমার যা মনে হল পরিমাণ একদমই ঠিকঠাক, বিরিয়ানিতে প্রতিটা মশলা ঠিকঠাকভাবে মিশেছে, মাটনের পিসটা বেশ বড়, একদম নরম ও সুস্বাদু আর ছিলো সারা বিরিয়ানি জুড়ে বেশ কিছু কোফতি বা মাটনের কিমা দিয়ে বানানো মিটবল, এটাও রয়্যালের একটা স্পেশালিটি। তবে আমাকে বা বলা ভালো আমাদের সবাইকে বেশ চমকে দিয়েছে মুর্গ মশল্লম, বহু পুরোনো এই পদের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘দস্তরখান-এ-আওয়াধ’ বইতে, আবুল ফজলের ‘আইন-ই- আকবরী’ বইতে এবং ইবন বতুতার বিবরণ থেকে জানা যায় মহম্মদ-বিন-তুঘলকের অন্যতম প্রিয় ছিলো এই পদ। রয়্যালের মুর্গ মশল্লমের প্রেশেণ্টেশানটা ব্যাপক ছিলো আর খেতেও ছিলো অসাধারণ, মুখের ভেতর চলতে লাগল বিরিয়ানি আর মুর্গ মশল্লমের দাঙ্গা কিন্তু সেই দাঙ্গায় মন আর পেট দুজনেই ছিলো চরম সুখী। এতো কিছুর পরেও মনে হচ্ছিল হ্যাপি এন্ডিং হচ্ছে না তাই শেষ পাতে শাহি টুকরা বিশুভাইয়ের ভাষায় ‘ মোগলাই ব্রেড পুডিং’। আমি অনেক জায়গায় শাহি টুকরা খেয়েছি কিন্তু রয়্যালের শাহি টুকরা খেয়ে সবচেয়ে ভালো লাগলো, বলতে লজ্জা নেই আস্তে আস্তে উপভোগ করে অল্প অল্প করে অনেকটা সময় ধরে খেয়েছিলাম, তাতে রয়্যালের স্টাফেরা হয়তো একটু বিরক্ত হয়েছিল কিন্তু সেসবে আমার বয়ে গেছে।

অবশেষে প্রাণভরে একরাশ মহাভোজের পরে আমরা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম কলকাতার গরমে, মন আর মেজাজ দুইই একদম ফুরফুরে। রয়্যালের ব্রেন টনিক নিয়ে আমরা তখন ৫০ডিগ্রী গরমের সাথেও পাঙ্গা নিতে পারি, এগিয়ে চললাম আমরা একদল পেটুক পিছনে রইলো সত্যজিৎ রায়, উত্তমকুমার, রাজ কাপুর, খুশওয়ান্ত সিংয়ের প্রিয় রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেল আবার আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে।

তথ্যসূত্র: ১. Royal two, The Telegraph, 27.05.2016

২. Royal Indian Hotel, Chitpur written by Indrajit Lahiri, 26.03.2015

#কলকাতার_এক_কলমচি

২০/০৪/২০১৯

 

 

চিকেন হরিয়ালি কাবাব
চিকেন কস্তুরী কাবাব
মাটন কোফতি বিরিয়ানি
মুর্গ মশল্লম
শাহি টুকডা

সেইসব সিঙ্গেলস্ক্রিনেরা

খবরটা প্রথম ফেবুতেই দেখি, অয়ন (অয়ন রায়) নিজের দেওয়ালে শেয়ার করেছিল, উত্তর কলকাতার হাতিবাগানের “মিত্রা” সিনেমাহল পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথমে বিশ্বাস করিনি কারণ ফেবুর দৌলতে গুজব তো কম ছড়ায় না, কিন্তু বিভিন্ন জায়গা থেকে জানতে পারলাম যে খবরটা সত্যি আর সেটা জানার পর থেকেই এক অদ্ভূত মনখারাপ ঘিরে ধরেছিল। সঞ্জীবের (সঞ্জীব দত্ত) ‘মিত্রা’ নিয়ে স্মৃতিচারণাটা পড়ে মনখারাপটা বেশ জাঁকিয়ে বসল।এরপর বিভিন্ন বাংলা আর ইংরাজি দৈনিকে ছোট ছোট বক্সে বেরোতে লাগল খবরটা। এক ঝটকায় বছর বারো পিছিয়ে গেলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি সিনেমা-থিয়েটার দেখতে ভালোবাসি কিন্তু সিনেমাহলে খুব একটা যাওয়া হতো না। বাবা মায়ের সাথে মাঝেমধ্যে, যেমন ২০০৩ সালে লেকটাউনের ‘জয়া’-তে ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’। তখন মাল্টিপ্লেক্স কি আমরা জানি না, আইনক্স সবে কলকাতায় পা রাখছে। আমি সিনেমাহল বলতে বুঝতাম কাঠের বা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে যেখানে পাশপাশি দুজন হাত রাখলে ঠোকাঠুকি লাগতো, এগিয়ে পিছিয়ে হাত রাখাটাই ছিলো অলিখিত নিয়ম। দুপাশের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে থাকতো বড় বড় পাখা আর হলের দেওয়াল ও ছাদে থাকতো রকমারি টাইলস বসানো। সামনে থাকতো বিশাল সাদা পর্দা, অবাক বিস্ময়ে দেখতাম প্রিয় নায়কদের এন্ট্রি সিন, কিংবা মন ছুঁয়ে যাওয়া ডায়লগ বা টানটান অ্যাকশন সিন। হাফটাইমে ঝপ করে পুরো প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলে উঠতো আর শুরু হতো ফেরিওয়ালাদের ডাক ‘এই বাদাম, সল্টেড বাদাম’ কিংবা ‘ আলু চিপস, পটেটো চিপস’ বা পপকর্ণ কেনার আহ্বান। তখন পপকর্ণ বলতে জানতাম তিন বা পাঁচটাকার বা খুব বড় প্যাকেট হলে দশটাকার যাতে এতোটাই থাকতো যে সিনেমা শেষ হওয়া অব্দি মুখ চালানো যাবে। এখন মাল্টিপ্লেক্সে পপকর্ণও ৩০০-৩৫০টাকা দাম তার আবার কতোরকম কায়দা চকলেট পপকর্ণ বা ক্যারামেল পপকর্ণ আরো কত কি। ২০০৬ সালে বন্ধুদের সাথে প্রথম দেখতে যাই ডানলপের ‘সোনালী’- তে আমির খান ও কাজল অভিনীত ‘ফানা’, তারপর শাহরুখ খানের ‘ডন’। এরপর আজ অব্দি সোনালীতে যে কত সিনেমা দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। সিঙ্গেলস্ক্রিন হলেও মাল্টিপ্লেক্স-এর সাথে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য নিজেকে অনেক পাল্টেছে সোনালী বসার সিট, স্ক্রিন, a.c. আর এই মফস্বলে সেইরকম কোনো মাল্টিপ্লেক্স না থাকায় এখনো চালিয়ে নিচ্ছে ডানলপের এই প্রেক্ষাগৃহটি। আমার স্কুল কলেজ সবটাই উত্তর কলকাতায়, গ্র্যাজুয়েশন করার সময় টুকটাক ক্লাস অফ পেলে বা কলেজের পরে প্রচুর সিনেমা দেখেছি। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের একদম কাছেই তিনটে অনেক পুরোনো সিনেমাহল আছে, শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের পাশে ‘ছবিঘর’, এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজের উল্টোদিকে ‘প্রাচী’ আর শ্রদ্ধানন্দ পার্কের গায়ে ‘পূরবী’। এই পূরবী ছিল আমার সেই সময়ের সাথী, তখন টিকিটের এতো দাম ছিল না ২০-৩০ টাকায় আরামসে সিনেমা দেখা যেতো আর এখন আমরা টিকিটের অনলাইন বুকিংয়ের জন্য ইন্টারনেট হ্যান্ডলিং চার্জ দিয়ে থাকি ২০-৩০ টাকা। পূরবীতে ‘চক দে ইন্ডিয়া’, ‘সাওয়ারিয়া’, ‘বচ না অ্যায় হাসিনো’ সহ বিভিন্ন সিনেমা দেখেছিলাম, ১৯৩৬ সালের ১৪ই অগাস্ট পথচলা শুরু এই সিনেমাহলের যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১লা এপ্রিল,২০১৬ সালে। দীর্ঘ আশি বছরের যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে পূরবী তাঁর প্রতিবেশী প্রেক্ষাগৃহ ‘অরুণা’-র মতোই আজ তালাবন্ধ। বাবার কাছে শুনেছি আমার ঠাকুমা ‘অরুনা’-তে বিভিন্ন জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা দেখতে যেতেন, তবে আমি বরাবর এই হলটাকে বন্ধই দেখে আসছি, পূরবীর পরে ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অরুণা শুরু হলেও বছর পঞ্চাশের মধ্যেই এই হল বন্ধ হয়ে যায়। শিয়ায়লদহ ফ্লাইওভারের ঠিক গায়েই টিমটিম করে এখনো চলছে ‘ছবিঘর’, তবে অবস্থা খুবই খারাপ অথচ এই হলেই ১৯৬৯ সালে আমাদের সকলের প্রিয় সত্যজিৎ রায়ের “গুপী গায়েন বাঘা বায়েন” টানা ৩৩ সপ্তাহ চলেছিল। এদের মধ্যে প্রাচীর অবস্থা মন্দের ভালো, এদের সিট নম্বরগুলো বাংলায় লেখা, আগে প্রাচীতে শুধু বাংলা সিনেমা হতো, এখন মাল্টিপ্লেক্সের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য হিন্দি ও ইংলিশ সিনেমাও এরা দেখাচ্ছে, কিন্তু ‘মিত্রা’-র হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কোনো সিঙ্গেলস্ক্রিন নিয়েই ঠিক ভরসা করা যায় না যে কোনটা কতোদিন থাকবে।

আমেরিকান চিত্রনির্মাতা ডেভিড লিঞ্চ বলেছিলেন, “Cinema is a language” আর আমরা সকলেই জানি ভারতে তৈরি প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ১৯৩১ সালের ১৪ই মার্চ মুক্তিপ্রাপ্ত খান বাহাদুর আর্দেশির ইরানির “আলম-আরা”, যা বোম্বের ম্যাজেস্টিক প্রেক্ষাগৃহে টানা আট সপ্তাহ হাউসফুল চলেছিল। ভারতীয় সবাক সিনেমা এই দেশের মানুষের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে সারাদেশ জুড়ে গড়ে উঠতে লাগল একের পর এক সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমাহল যেগুলোর বাইরে একসময় মানুষের ঢল নামত আর যা সামলাতে হল-মালিকদের রীতিমতো বেগ পেতে হতো। আর তারাই আজ আধুনিকতার সাথে পাল্লা না দিতে পেরে, কিংবা প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাবে সর্বোপরি দর্শকদের অভাবে নিজেদের হলের দরজা এক এক করে বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিধান সরণিকে বলা হত ‘সিনেমাপাড়া’, ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির পাশেই বীণা সিনেমা দিয়ে শুরু, এছাড়া ছিল আরো একাধিক প্রেক্ষাগৃহ- রূপবাণী, শ্রী, মিত্রা, উত্তরা, রাধা, দর্পণা, মিনার, পূর্ণশ্রী, সুরশ্রী, গ্রেস, খান্না, বিদুশ্রী, টকিশো হাউস। এদের মধ্যে রূপবাণী নির্মিত হয়েছিল ইন্দো-ইউরোপীয়ান মেলবন্ধনে আর ছিলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিসহ স্টেট-অফ-দ্য আর্ট ভেন্টিলেশন সিস্টেম। এই প্রেক্ষাগৃহের নামকরণ ও দ্বারোদঘাটন দুইই করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যদিও সেই রূপবাণী বন্ধ হয়ে সেখানে বহুদিন হলো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ‘কলকাতা ফ্যাশন বাজার’ নামে একটি শপিং মল। কলেজে পড়াকালীন ‘রাধা’ সিনেমাহলে দেখেছি ‘রব নে বানা দি জোড়ি’ এবং ‘দোস্তানা’ আর আজ সেখানে ‘বাটা’-র জুতোর দোকান আর পাশেই ‘বাজার কলকাতা’। শোনা যায়, গ্রেস সিনেমাহলে ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর একটা সিনেমা একটানা বেশ কয়েক সপ্তাহ হাউসফুল গেছিলো, এটা শুনে কলকাতায় এসে গ্রেসের মালিকের সঙ্গে দেখা করে গেছিলেন দুজনে। সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘মিত্রা’ সিনেমাহলের শুরু থেকে শেষ পুরোটাই রকমারি ইতিহাসে আবৃত। ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দেশে ফিরে ১৯৩০ সালে ‘চিত্রা’ প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তুলেছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার যিনি বি.এন.সরকার নামেই সকলের কাছে বেশী পরিচিত। সেইসময় কলকাতার মেয়র ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, তিনিই উদ্বোধন করেন ‘চিত্রা’ সিনেমাহল এবং ডাক দিয়েছিলেন স্বদেশী সিনেমা তৈরি করার। সুভাষচন্দ্রই বি.এন.সরকারকে পরামর্শ দেন ব্রিটিশ সিকিউরিটি গার্ড না রেখে স্বদেশী লেঠেল রাখার, যাদের কাজ ছিল দর্শকদের লাইন করে সিনেমা হলে ঢোকানো আর কোনো হাঙ্গামা হলে সেগুলো সামলানো। বি.এন.সরকার চিত্রা তৈরির কিছুমাস বাদে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও গড়ে তোলেন, পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সবাক বাংলা ছবি ‘দেনাপাওনা’ দিয়ে নিউ থিয়েটার্স ও চিত্রা যাত্রা শুরু করেছিল।ভারতীয় চলচ্চিত্রে বীরেন্দ্রনাথ সরকারের অবদান অনস্বীকার্য, যার প্রাপ্য সম্মান স্বরূপ ১৯৭০সালে “দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার” এবং ১৯৭২সালে “পদ্মভূষণ”-এ ভূষিত হয়েছিলেন। মিত্রার বর্তমান মালিক দীপেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র-এর ঠাকুরদা হেমন্তকৃষ্ণ মিত্র ১৯৬৩সালে চিত্রার নাম পাল্টে রাখেন ‘মিত্রা’, ১৯৩০সাল থেকে শুরু করে এই ২০১৯-এ ৮৮ বছর বয়সে নিজের যাত্রা শেষ করলো মিত্রা, এমনকি শেষ চলা সিনেমা অক্ষয়কুমারের ‘কেশরী’ দেখতেও ভালোই ভিড় হয়েছিল। আমি এই হলে প্রথম দেখেছিলাম ইমতিয়াজ আলির ‘জব উই মেট’, এরপর বহুবার এখানে বিভিন্ন সিনেমা দেখেছি, এমনকি বেশ কিছুবছর হলো মিত্রা নিজের ভোল পাল্টে ফেলেছিল, উন্নতমানের পুশব্যাক সিট, a.c., চেয়ারের হাতলে জলের বোতল রাখার জায়গা, ৭.১ ডলবি সিস্টেম, সিমলেস প্রোজেকশন স্ক্রিন এইসব কিছু নিয়ে নতুনসাজে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। এই হলে আমার দেখা শেষ সিনেমা ‘প্রজাপতি বিস্কুট’, কমলিকা, বিশু, সংহিতা আর শর্মিষ্ঠারও ছিলো সেদিন আমার সঙ্গী। এই চত্বরের আরো তিনটি মৃতপ্রায় প্রেক্ষাগৃহ হলো ‘দর্পণা’ যাকে বাইরে থেকে দেখলে বন্ধই মনে হয় আর মিত্রার উল্টোদিকে অবস্থিত ‘মিনার’ অথচ বাংলা সিনেমার একসময়ের ধারক-বাহক ছিলো এরা। শোনা যায় ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ দেখতে মিনারে এতোই ভিড় হয়েছিল যে কতৃপক্ষকে হলের পিছন দিকে তাঁবু খাটিয়ে দর্শকদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিলো। ‘অ্যাক্রস টু সিঙ্গাপুর’ দিয়ে মিত্রার সাথেই যাত্রা শুরু করেছিলো ‘টকি শো হাউস’, প্রতি রবিবার সকালে থাকতো নতুন ধরনের কোনো ইংরেজি সিনেমা। সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম প্রিয় হল ছিলো এটি, এক সকালে সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘ইভান দ্য টেরিবল’ দেখতে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। উত্তর কলকাতার মতো দক্ষিণ কলকাতারও বেশ কিছু সিঙ্গেলস্ক্রিন আজ বন্ধ যেমন পূর্ণা, ভারতী, উজ্জ্বলা, মহুয়া, মালঞ্চ এবং আরো অনেকে। ১৯২১সালে তৈরি হওয়া পূর্ণার প্রথম নাম ছিলো প্যারিস থিয়েটার আর এখানেই মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ আর ‘পরশ পাথর’ এবং দুটোই ছিলো মেগাহিট। ভবানীপুরের ভারতীতে মুক্তি পেয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের আরো দুটি সিনেমার ‘তিন কন্যা’ আর ‘অপুর সংসার’। ১৯৭৭সালে স্থাপিত এবং ২০১৫ সালে বন্ধ হওয়া ‘মহুয়া’-তে প্রদর্শিত শেষ ছবি ছিলো শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ‘বেলাশেষে’ যা এই প্রেক্ষাগৃহের শেষদিনকে চিহ্নিত করে যায়।

এতো গেলো বিধান সরণির আর দক্ষিণ কলকাতার ‘সিনেমাপাড়ার’ হলগুলির দুরবস্থার কথা। কিন্তু কলকাতার কিছু নামকরা সিঙ্গেলস্ক্রিনের কথা না বললে এই লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, সেই হলগুলোও আজ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। ১৯৩০সালে লেনিন সরণিতে তৈরি হয় ‘জ্যোতি’ সিনেমাহল, প্রথমে শুধু হিন্দি ছবি দেখালেও, ১৯৭০সাল থেকে শুরু হয় ৭০মিমি স্ক্রিনিং এবং দেখানো শুরু হয় ইংরেজি সিনেমাও। ভারতীয় সিনেমাজগতে বেশ কিছু সিনেমাকে ম্যাগনাম ওপাস ধরা হয় মুঘল-এ-আজম এবং শোলে তাদের মধ্যে অন্যতম, ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শোলে জ্যোতি সিনেমা হলে একবছরের বেশী সময় (১০৩ সপ্তাহ) চলেছিল এবং যার প্রায় ৭৫% শো থাকতো হাউসফুল। আমার বাবা প্রায়ই আমায় বলে জ্যোতিতে ‘শোলে’ দেখার কথা। ২০০৮ সালে নাগাদ চরম আর্থিক মন্দার সম্মুখীন হয়ে জ্যোতি কতৃপক্ষ হল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিনের মৃত ‘জ্যোতি’-এর অন্ত্যেষ্টি হয় ২০১৬সালের এক ভয়ঙ্কর আগুনে। জ্যোতি সিনেমাহল থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে ছিলো ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ প্রেক্ষাগৃহ (প্রায় ১৪০০ আসন বিশিষ্ট) লাইটহাউস। ভালো মানের ইংরেজি সিনেমা দেখানো ছিল এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, ১৯৩৮সালে এখানে দেখানো হয়েছিল প্রথম ছবি ‘ফ্যান্টাসিয়া’। ডব্লু.এম.ডিউডকের নকশাকৃত এই প্রেক্ষাগৃহটি ২০০২সালে বন্ধ হয়ে যায়, তার বেশ কিছুবছর পরে সেখানেই এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দ্বিতল বিশিষ্ট ‘সিটি মার্ট’ শপিং মল। লাইটহাউস থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে গ্লোব সিনেমাহল যার প্রথম নাম ছিলো ওল্ড অপেরা হাউস। ১৯২২সালে চালু হওয়া এই হলের প্রথম সিনেমাটি ছিলো নির্বাক নাম ‘আ স্পোর্টিং ডাবল’, এটিও এখন শপিং মলে পরিবর্তিত হয়েছে। আমেরিকান নামকরা প্রোডাকশন কোম্পানি ‘মেট্রো-গোল্ডউইন-ম্যায়ের’ ১৯৩৫সালে কলকাতায় ‘মেট্রো’ সিনেমাহলের সূচনা করে, থিয়েটার আর্কিটেক্ট থমাস ল্যাম্ব কলকাতা ও মুম্বাই-এর মেট্রো সিনেমাহলের ডিজাইন করেন। এই হলে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ‘ওয়ে আউট ওয়েস্ট’ অথবা ‘দ্য বোহেমিয়ান গার্লস’। চল্লিশ থেকে সত্তর দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে মেট্রো ছিলো দর্শকদের কাছে আভিজাত্যের এক অন্যতম নাম। কিন্তু সবকিছুরই একটা শেষ হয়, বাকিদের মতো মেট্রোও ২০১১সালে বন্ধ হয়ে যায়, তবে শোনা যাচ্ছে এই বছরের শেষের দিকে শপিং মলসহ মেট্রো সিনেমাহল আবার ফিরছে যার নতুন নাম হবে ‘মেট্রো আইনক্স’। এবার আসি ‘এলিট’ সিনেমাহলের কথায়, নিউমার্কেট চত্বরে প্রায় আশি বছর ধরে চলার পর গত বছর বন্ধ হয়ে গেছে এই সিনেমাহলটি। ১৯১৫ সালে তৈরি হয়ে ওঠা এলিটের প্রথম নাম ছিলো ‘প্যালেস অফ ভ্যারাইটি’, ১৯৩৮সালে যা বদলে হয় এলিট। সুদূর ব্রিটেন থেকে আর্কিটেক্ট রিডলি অ্যাবট এবং তারপর আর্কিটেক্ট জন ফার্নান্দেজ এলিটকে ‘এলিট’ হিসাবে গড়ে তোলেন। এলিটের প্রোজেক্টর আনা হয়েছিল ইতালি থেকে এবং 20th সেঞ্চুরি ফক্স-এর সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ১৯৪৮সালে জন ওয়েনের বিখ্যাত কাউবয় মুভি ‘রেড রিভার’ দিয়ে এলিট নিজের দরজা খোলে। প্রথমদিকে একচেটিয়া ইংরেজি সিনেমা দেখালেও একসময় হিন্দী ও বাংলা সিনেমাও দেখাতে শুরু করে এলিট, মুঘল-এ- আজম এই হলে দীর্ঘদিন সাফল্যের সাথে চলেছিল। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনের ছবি ‘ভুবন সোম’- এর প্রিমিয়ার হয়েছিল এলিটে, মৃণালবাবুর মতে এলিটের প্রোজেকশান সিস্টেম অত্যন্ত আধুনিক মানের এবং তাঁর খুবই পছন্দের।শুধু সাধারণ মানুষ নয় এলিটে সেইসময় ভিড় জমাতেন সব নামকরা মানুষজন, মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়, গৌতম ঘোষ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন প্রমুখেরা। এলিটে হওয়া শেষ সিনেমা ছিলো ২০১৮তে মুক্তিপ্রাপ্ত জন আব্রাহামের ‘পরমাণু’। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে নিউ এম্পায়ার, রক্সি, প্রিয়া সিনেমা বা লেকটাউনের জয়া সিনেমাহল এখন বিভিন্নরকম পরিবর্তন করে কলকাতার বুকে সদ্য গজিয়ে ওঠা মাল্টিপ্লেক্সগুলোর সাথে টক্কর দিচ্ছে।

দুটো ঘটনা বলে লেখাটা শেষ করবো। ১৯০২ সালে বোম্বাই থেকে কলকাতায় আসেন জামশেদজী ফ্রামজি মাদান নামে এক পারসী ভদ্রলোক এবং কলকাতায় গড়ে তোলেন ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি’ এবং ৫/১ চৌরঙ্গী প্লেসে তৈরি করেন ভারতের প্রথম সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হল ‘চ্যাপলিন’, যার প্রথম নাম ছিলো এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস। তিনিই কলকাতার তথা ভারতের বুকে নিয়ে আসেন বিদেশ থেকে আনা প্রথম টকি, নির্বাক ছবির যুগ পেরিয়ে ভারতের মানুষ প্রথম এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেসে যে টকিটি দেখেছিলেন তার নাম ছিলো আর্ক হিথের ‘মেলোডি অফ লাভ’। পরে এই সিনেমাহলের নাম হয় চ্যাপলিন ও মিনার্ভা, শোনা যায় মহানায়ক উত্তমকুমারের বাবা এই হলে প্রোজেক্টর চালাতেন। কলকাতা পুরসভা এই হলটির দায়িত্ব নিলেও এর গুরুত্ব বুঝতে অসমর্থ ছিলেন তাই বলে ২০১৩সালে এই ঐতিহ্যশালী বাড়িটি ভেঙ্গে ধূলিসাৎ করে দেওয়াটাও কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না, হয়তো এখানেই হতে পারতো কোনো ফিল্ম মিউজিয়াম বা আর্কাইভ।

শেষ ঘটনা একসময়কার নামকরা কিন্তু প্রধানত একদমই সাধারণ মানুষদের জন্য থাকা এক সিনেমাহল নিয়ে। রাজাবাজার অঞ্চলে আমরা সবাই কমবেশী গেছি, এখানেই ছিলো ‘তসবীর মহল’ যার মালিক শাফিকুল ইসলাম শাবাজ। ২০১৫সালের ৩১শে ডিসেম্বর এখানে শেষ শো হয়, শাবাজের কথায়,”সারা শহর যখন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আর আনন্দ করতে ব্যস্ত, আমি তখন আমার হলের শেষ শো-এ আসা চল্লিশজন দর্শকের চলে যাওয়ার ভিডিও করছিলাম।” শাবাজের ঠাকুরদা ছিলেন এই হলের মালিক, অমিতাভ বচ্চনের ‘কুলি’ এই হলে ত্রিশ সপ্তাহ এবং শোলে চলেছিল পঞ্চাশ সপ্তাহ। মিঠুন চক্রবর্তীর ‘জল্লাদ’ সিনেমা চলাকালীন এসেছিলেন এই হলে। শাহরুখের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ কিংবা আমিরের ‘রাজা হিন্দুস্তানী’ দুটোই হাউসফুলসহ এই হলে চলেছিল টানা ১৫সপ্তাহ। শাবাজের শেষ ইচ্ছাটা অবশ্য অন্যরকম শেষ একবার তিনি এই হলে বসে ‘রাজা হিন্দুস্তানী’ সিনেমাটা দেখতে চান অবশ্য সাথে থাকবে একরাশ সুখস্মৃতি, না চাইতেও যেনো কোথাও গিয়ে শাফিকুল শাবাজ আর কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘সিনেমাওয়ালা’ ছবির ‘কমলিনী’ সিনেমাহলের মালিক বৃদ্ধ প্রণবেন্দু দাস মিলেমিশে এক হয়ে যান।

কলকাতার ৮৬টা সিঙ্গেল স্ক্রিনের মধ্যে প্রায় ৫০টি বন্ধ বাকিগুলোও ধুঁকছে বা বন্ধ হওয়ার মুখে। আধুনিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা, আর্থিক দৌর্বল্য, প্রশাসনিক ঔদাসীন্য, দর্শক বিমুখতা হলগুলি বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ। ‘মিত্রা’ বন্ধ হওয়ার পর বারদুয়েক ওর সামনে দিয়ে গেছি মনখারাপ হয়েছে খুবই যেমন প্রথম প্রথম হতো বন্ধ ‘পূরবী’ সিনেমাহলকে দেখে। আজ সকালেই বোনের সাথে কথা হচ্ছিলো সিনেমা দেখতে যাওয়া নিয়ে তখন অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে ‘মিত্রা’টা বন্ধ হয়ে গিয়ে বড় মুশকিল হয়েছে। মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ দেখেছিলাম পরপর দুবার একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে, প্রতিটা বন্ধ সিনেমাহলকে দেখে আজ এক একটা খণ্ডহর বলেই মনে হয় আর মিত্রা এই দলে নতুন সংযোজন।

তথ্যসূত্র

১. The end of single screen theatres, Priyanka Dasgupta, Times of India, Apr 23,2016.

২. Rise and fall of dream theatre, The Telegraph, July 02,2012.

৩. The dying pulse of single screen cinemas, The Telegraph, Oct 20,2018.

৪. Heritage cinemahalls fadeout, Manjira Majumdar, The Hindu.

ছবি: ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।

(কলকাতার এক কলমচী)

০৯/০৪/২০১৯

B.N.Sircar
Satyajit Ray’s “Teen Kanya” at Bharati Cinema Hall