লেখার নাম দেখে অনেকেই ভাবছেন আরে এতো আমাদের দুটো চেনা চরিত্র, এদের গল্প কে না জানে!! কিন্তু এই ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্প একদমই আলাদা। যদিও এই গল্পেও জয় ডেভিডেরই হয়েছে, তবে গোলিয়াথের মনে হারের দুঃখ একদমই নেই উল্টে গোলিয়াথের বেশ ভালোই লাভ হলো।
আমি যেমন অনেক কিছুই জানি না, বলা ভালো কোনো ব্যাপারেই আমার বিশেষ জ্ঞান নেই। তাও কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পাই মোটামুটি শেয়ার করেনি। ১০০ জনের মধ্যে ৯৮জন ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্প জানে, যে দুজন জানে না তাদের জন্য ছোট্ট করে বলে ফেলি। আমি স্কুলে পড়াকালীন বাইবেলে এই গল্পটা প্রথম পড়েছিলাম। অনেক যুগ আগের কথা তখনো যীশুখ্রীস্ট জন্মগ্রহণ করেননি, মেসোপটেমিয়ার রাজা দ্বিতীয় নেবুকাডনেজারের সাথে বিভিন্ন কারণ নিয়ে প্যালেস্টাইনের দক্ষিণ উপকূলে থাকা ফিলিস্টাইনদের ঝামেলা ছিল আর রাজার মর্জিমাফিক না চললে ঝামেলা যে লেগেই থাকে সেটা আমরা ২০১৯ বা ২০২০ তেও দেখতে পাচ্ছি । এরপর মেসোপটেমিয়া দিয়ে অনেক জল বয়ে যায়, ফিলিস্টাইনদের মাঝে উঠে আসে এক নতুন নেতা গোলিয়াথ, হিব্রু বাইবেল যাকে দৈত্য বলে আখ্যা দিয়েছে। আসলে সমাজের জড়ভরত সিস্টেমের বিরুদ্ধে কেউ রুখে দাঁড়ালেই সে এই ধরনের আখ্যা পেয়ে থাকে, কিন্তু গোলিয়াথকে পেয়ে ফিলিস্টাইনরা খুব খুশী, এবার রাজার চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে। বেশকিছু যুদ্ধে ইজরায়েলীয়দের গোলিয়াথ হারিয়েও দ্যায়, ভয়ে ইজরায়েলীয়রা ফিলিস্টাইনদের ধারেকাছে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ডেভিডের দাদা জেসি ছিল ইজরায়েলীয় সৈনিক, এইরকমই এক যুদ্ধের সময়, ডেভিড উপস্থিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে দাদার জন্য জল আর খাবার নিয়ে। সেই প্রথম ডেভিড গোলিয়াথকে চাক্ষুষ করে, গোলিয়াথের রণহুঙ্কার শুনে দাদাকে ডেভিড বলে, ” আপুন ইসকা ব্যান্ড বাজায়েগা”। দাদা তো রেগে আগুন, বলে কি পুঁচকে ছেলেটা, ভেড়া চরানো যার কাজ, সেকিনা গোলিয়াথকে মারবে!! কিন্তু ডেভিডও প্রতিজ্ঞায় স্থির, দাদাকে দিলো সেই আদি অকৃত্রিম ডায়লগ, যার কেউ নেই তাঁর সাথে ভগবান আছে। এই বলে পাঁচটা পাথর আর গুলতি নিয়ে গোলিয়াথের মুখোমুখি হলো। ডেভিডকে দেখে গোলিয়াথের প্রচুর হাসি পেলো আর খিল্লিও করলো। কিন্তু কথায় আছে স্যাকরার ঠুকঠাক আর কামারের এক ঘা, গুলতিতে পাথর লাগিয়ে ডেভিড দিল এক টান আর পাথর সোজা গিয়ে লাগলো গোলিয়াথের কপালের মাঝে। ঘটনার আকস্মিকতায় আর পাথরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল গোলিয়াথ আর সেই সুযোগে তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ করল ডেভিড।
এই ছিলো মোদ্দা গল্প, এবার ফিরে আসি আজকের ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্পে। কলকাতার শীত এবার শুরু থেকেই চালিয়ে খেলছে, কলকাতাবাসীর অভিযোগ করার কোনো সুযোগ দিতে সে রাজি নয়। অফিস থেকে বেরোতেই সে বুঝিয়ে দিলো আজ ফুল ফর্মে আছে। ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে চলেছি নাগেরবাজারের দিকে, এদিকে খিদেও পাচ্ছে। যত হাঁটছি খিদেটাও আস্তে আস্তে গোলিয়াথের মতো দৈত্যাকৃতি রূপ নিতে থাকল। নাগেরবাজার মোড়ের থেকে বাঁদিকে ঘুরতেই পেট আর খিদে দুজনেই গোলিয়াথের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল। তখনই আমি দেখা পেলাম ডেভিডের, মানে ‘ডেভিড ফাস্টফুড শপ’। এই ডেভিড অবশ্য পাথর আর গুলতি নিয়ে আমায় ওয়েলকাম করেনি, বরং একরাশ লোভনীয় কাবাব আর তন্দুরীর পসরা সাজিয়ে বসেছিল।
এই দোকানের বিশেষত্ব হলো লাইভ বার্বিকিউ, আপনার কাজ হলো শুধু মেনু দেখে অর্ডার দিন আর চোখের সামনে হতে দেখুন আপনার পছন্দ করা চিকেনের আইটেমটি। ডেভিডের দোকানে মেনুতে মারাত্মক ভ্যারিয়েশন না থাকলেও যা আছে তাতে দিব্যি চলে যাবে আর দাম একদম নাগালের মধ্যে। অর্ডার দেওয়ার আগে মেনুতে কি কি রেখেছে ডেভিড সেটা দেখে নিলাম, রোস্টেড চিকেন উইংস প্রতি পিস ২৫ টাকা, চিকেন লেগ তন্দুরী প্রতি পিস ছোট ৫০ টাকা আর বড় ৮০ টাকা, চিকেন সলিড পিস তন্দুরীও ৮০ টাকা, চিকেন টিক্কা কাবাব একটা শিক ৫০ টাকা (পাঁচ পিস থাকে), চিকেন পকোড়া ১০ টাকা পিস, এছাড়া লোটে মাছের ফ্রাই, ফিশ ফিঙ্গার, চিকেন ললিপপ সবেরই দাম ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। তবে আমি যা দেখলাম কাবাব আর তন্দুরীর বাইরে বাকি আইটেমগুলোর চাহিদা সেরকম নেই।
ভারতে লাইভ কাবাব আর তন্দুরীর কাউন্টারসহ রোস্টেড কার্টের কনসেপ্ট নতুন না হলেও কলকাতায় এখনো নতুন। আমার চেনা পরিচিতির মধ্যে আছে কসবা বকুলতলার দেবাংশু দে ও সোমা দে-এর ‘রোস্টেড কার্ট’। যদিও আমার এখনো গিয়ে ওঠার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু ওনাদের রোস্টেড কার্ট-এর ভ্যারিয়েশন বেশী আর দাম সামান্য বেশী হলেও শুনেছি খাবার নাকি দারুণ। উত্তর কলকাতা বা তৎসংলগ্ন এলাকায় এইরকম রোস্টেড কার্ট আগে দেখিনি, ডেভিডকে ধন্যবাদ এই উদ্যোগের জন্য।
মেনু দেখে একটা রোস্টেড চিকেন উইংস আর একটা চিকেন লেগ তন্দুরী অর্ডার দিলাম। এই ফাঁকে ডেভিডের সাথে গল্প জুড়লাম, কথায় কথায় জানলাম আগে আর্সালানে অনেকদিন কাজ করার পর একসময় নিজের স্টার্টআপের কথা ভাবতে শুরু করে আর সেখান থেকেই এই কাজের শুরু। ডেভিডের প্ল্যান ছিল কাবাব আর রোস্টেড চিকেন সবাই যাতে খেতে পারে আর তাদের পকেটেও চাপ যাতে না পরে। সেইজন্যই কোয়ালিটির সাথে আপোষ না করেও এই দামের মধ্যে কাবাব আর তন্দুরী বানাচ্ছে। আরো নিজের এইকাজ নিয়ে নানারকম পরিকল্পনার কথা বলল ডেভিড, এরই মাঝে রোস্টেড চিকেন উইংস আর চিকেন লেগ তন্দুরী চলে এল মশলা ও স্যালাড সহযোগে। দুটি আইটেমই জাস্ট দারুণ ছিল, নুন যথাযথ, রোস্ট একদম পারফেক্ট আর সাথে ছিল সেই স্মোকি ফ্লেভার। উপরের ঝলসানো মাংসের পরত-এর তলায় রয়েছে সাকুলেন্ট আর তুলতুলে মাংসের বাকি স্তরগুলো আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার প্রতিটা জিনিস একদম ফ্রেশ। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ধীরে সুস্থে খাওয়া দাওয়া শেষ করলাম। পেটের গোলিয়াথ ততক্ষণে ডেভিডের তন্দুরী চিকেন খেয়ে হার মেনেছে। সব মিলিয়ে আমার ৭৫/- টাকা হলো, ইচ্ছা তো করছিল বাকি আইটেমগুলোও চেখে দেখার, কিন্তু অন্যদিনের জন্য সেগুলোকে রেখে দিলাম।
খাওয়াদাওয়ার পালা চুকিয়ে ডেভিডকে গোলিয়াথ প্রমিস করে গেলো আবার আসার। ওদিকে এই ৯-১০ ডিগ্রী ঠাণ্ডায় জ্বলন্ত বার্বিকিউটার সামনে দাঁড়িয়ে যা আরাম হচ্ছিল সেটা ছিল রোস্টেড চিকেন উইংস আর চিকেন লেগ তন্দুরীর সাথে উপরি পাওনা। ব্যস্ আর কি এই ছিল ২০১৯-এর ডেভিড ও গোলিয়াথের কাহিনী। আপনারাও নাগেরবাজার চত্বরে বিকেল বা সন্ধের দিকে থাকলে ঢুঁ মারতেই পারেন ডেভিডের রোস্টেড কার্টে, আশা করছি খারাপ লাগবে না। কাবাব খেয়ে ভালো লাগলে না হয় মগনলালের মতন ‘নাজুক, নাজুক’ বলে উঠবেন আর খারাপ লাগলে নাহয় শুধু ছিঃ ছিঃ করবেন। তবে হ্যাঁ, হাতে সময় নিয়ে যাবেন, ভিড় বেশ ভালোই থাকে আর রোস্ট চলাকালীন তাড়া লাগাবেন না কারণ ভালো রোস্টেড চিকেন বানাতে সময় লাগে আর আচ্ছে দিনের জন্য যখন এতো বছর অপেক্ষা করলেন এইটুকু অপেক্ষাও করতে পারবেন।।






















































